ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আজ থেকে সারা দেশে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীরা গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ ও পথসভার মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ গরম করার পাশাপাশি উৎসবমুখর এই প্রচারণাকে ঘিরে বড় ধরনের শঙ্কার কথাও জানিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, সহিংস আচরণ এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রচারণা শুরুর প্রথম দিনেই লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জে ফেস্টুন লাগানোকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় জামায়াতের তিন কর্মী এবং বিএনপির এক কর্মী আহত হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
এরআগে প্রচারণা শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন।
এছাড়া সোমবার চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত এবং তিনজন গুরুতর আহত হন। একই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও লক্ষ্মীপুর সদরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্য এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এছাড়াও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। নজরদারির জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে ড্রোন এবং বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহারও নিশ্চিত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়ানো হয়েছে টহল, বসানো হয়েছে চেকপোস্ট এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বিশৃঙ্খল আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জনমনে আস্থা ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান টহল বাড়ানো হয়েছে এবং দেশব্যাপী ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। এছাড়া কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া দাগি অপরাধীদের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে যাতে তারা ভোটের মাঠে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। এ লক্ষ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ও পরিকল্পিত সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে, যার মধ্যে একাধিক টার্গেটেড কিলিংয়ের ঘটনাও রয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার উদ্দেশ্যে যে কোনো ধরনের নাশকতা বা সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি বাড়িয়েছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও এলাকায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরও দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘ওয়েল আন্ডার কন্ট্রোল’ রয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
এদিকে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে ঘিরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা এবং প্রশাসনের কঠোর অবস্থান সহিংসতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।








