যানজট, বিষাক্ত ধোঁয়া, ধুলোবালি, হর্ণ, খোঁড়াখুঁড়ি, পোড়া তেলের বাষ্প জমে থাকা সাড়ে চারশ’ বছরের পুরনো শহরটিতে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বের হওয়ার উপায় খুঁজছিলাম অনেকদিন।
সিদ্ধান্ত নিলাম অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও নিরব নিস্তব্দ, কিছুটা অচেনা-অজানা জায়গায় চলে যাবো। একাকী বসে থাকবো কোন বটবৃক্ষের নিচে কিংবা জলশায়ের কিনারে অথবা হেমন্তের কাশফুলের গ্রামে হারিয়ে যাবো। সেই উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া।
চললাম মোহাম্মদপুর হয়ে ঘাটারচর। থামলাম ঘাটারচরে একটি হ্রদের কিনারে। হ্রদটির পাশে একাকি বসে থাকতে আমার অসম্ভব ভালো লাগতো। কিছুক্ষণ পরপর দু-একটি নৌকা চলে। স্থানীয় নারী-পুরুষ গোসল করে, কাপড়-চোপড় পরিস্কার করে, মাছ ধরে। শিশুরা খেলাধুলা ও হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠে। বিশেষ করে বৃষ্টি নামার মুহূর্তে হ্রদের তাকিয়ে থাকতে আমর কী যে ভালো লাগতো! আর গ্রীস্মকালে তামাম পৃথিবী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অঙ্গার করে যখন সূর্য যখন হৃদটাতে হেলে পড়তো, সেই দৃশ্য দেখার আনন্দ আমি বুঝাতে পারবো না।
বছর দুয়েক আগে, বর্ষায় দুই ভাই-বোন হ্রদের পানিতে নেমে সাঁতরাচ্ছিল, ইচ্ছে করছিল আমিও নেমে যাই তাদের সাথে। ইচ্ছে করছিল হ্রদরে পাশে বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যাই। ঝুম বৃষ্টি, জলের ওপর জল গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে পাবো। শিশু-কিশোরদের হৈ-হুল্লোড় ও মেঘেঢাকা আকাশ দেখবো। এক বর্ষার বিকেলে চলে যাই হ্রদটির পাশে। হ্রদের পাশে একটি স্কুল রয়েছে। সেখানে বালকদের একটি দল ক্রিকেট খেলছিল। আমিও তাদের সাথে খেলা শুরু করলাম। খেলাধুলা শেষে সন্ধ্যা ফেরার সময় ওই ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য মন খারাপ হয়ে গেল, তাই ভাবলাম আরেকদিন যাবো, সেই কারণেও হয়তো আজ যাওয়া। গিয়ে দেখি, তারা কেউ নেই। সুনশান নিরবতা হ্রদটির আশপাশ। দু-য়েকজন লোক বড়শি বাইছিল।
বেশিক্ষণ না থেমে ছুটে চললাম কলাতিয়ার দিকে। কলাতিয়া থেকে সিএনজিতে রামেরকান্দা বাজারে। রামেরকান্দা থেকে বাসে দোহার জয়পাড়া বাজার। জয়পাড়ার সারাপথ কাশফুল আর ছোট ছোট নদীর শাখা-প্রশাখা, জলাশয় ও সবুজ বৃক্ষে ভরা। সময়টা ৯টার একটু বেশি। তখনও দূর থেকে কুয়াশা দেখা যাচ্ছিল। তখন আমার মনে হলো—কেন শহরে চার দেয়ালে বসে থাকি? কেন পৃথিবীটা দেখতে বের হই না? অথচ বিপুল এই পৃথিবী কত সুন্দর, কত নান্দনিক। শিবরামপুর গ্রামের সারা পথ যেন কাশফুলে ছেয়ে গেছে। বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে কাঁশফুল দেখতে থাকি।
হঠাৎ মনে পড়লো নবাবগঞ্জের এক বন্ধুর কথা। তার নাম নাহিদ। নাহিদ ভাইকে বললাম, আজ সারাদিন ঘুরবো, যেখানে ইচ্ছে সেখানে। বাইকে প্রথমে গেলাম পদ্মার পাড়ে। এপারে নবাবগঞ্জ ওপারে ফরিদপুর। গ্রামটির নাম নয়াপাড়া। হয়তো এটা কোনো গ্রামের নাম নয়, কিছু মানুষ সম্প্রতি বসবাস শুরু করে নাম দিয়েছে নয়াপাড়া।
সেখান কিছুক্ষণ থাকার পর নাহিদ জানালেন নবাবগঞ্জে কিছু প্রাচীণ জমিদার বাড়ি আছে, সেগুলো ঘুরে দেখাবেন।

সাববাড়ি
প্রথমেই চলে গেলাম গেলাম নবাবগঞ্জ উপজেলার শিকারি পাড়া ইউনিয়নের বক্তারনগর গ্রামের ঐতিহাসিক সাব বাড়িতে। মূলত বাড়িটির নাম সাহেব বাড়ি, লোকমুখে প্রচলিত সাববাড়ি। হেমন্তের খা খা দুপুর তখন। বক্তারনগর গ্রামের মেঠো পথের একপাশে মসজিদ অন্যপাশে সাববাড়ি। সামনে বিশাল মাঠ অন্যপাশে বিশাল এক পুকুর। পথের ওপাশ থেকেই জীর্ণ ও কিছুটা ধ্রুপদি স্থাপনার মতো দেখতে দ্বিতল বাড়িটি চোখে পড়ল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। ভবনের পলেস্তারা খসে পড়েছে, ইটের গাঁথুনির ভেতর বেশ বড় বড় বটগাছ জন্মেছে। বাড়ির কোনো দরজা–জানালা অবশিষ্ট নেই। কারুকাজগুলোর কোনো চিহ্ন নাই। তাই কয়েকটি ছবি তুলে দ্রুত বেড়িয়ে এলাম।
নাহিদ জানালেন, ভবনটি দেখতে দোতলা হলেও কিন্তু আসলে তিনতলা। পুরো ছাদটি খসে পড়ার কারণে এখন দ্বিতল বলে মনে হয়। এই বাড়ির দায়িত্বে এক বয়স্ক মানুষ ছিলেন। তিনি এখন আর নেই। কোথায় চলে গেছেন কেউ জানে না। মসজিদের সামনে একটি সমাধিভূমি রয়েছে। বক্তারনগরের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সমাধি রয়েছে সেখানে।
এই জমিদারবাড়ি সম্পর্কে মোহাম্মদ মাহমুদ আলি তার ‘পূর্ববঙ্গের জমিদারবাড়ি’ বইতে লিখেছেন, ‘আনুমানিক ১৭৫০ সালের দিকে শাহবুদ্দিন শাহ এই জমিদারির গোড়াপত্তন করেন। জমিদারবাড়ির আয়তন উল্লেখ করা রয়েছে পাঁচ বিঘা। সুলতান শাহবুদ্দিন শাহের মৃত্যুর পর জমিদারি পরিচালনা করেন তার ছেলে।’
তারপর সেখান থেকে চললাম আন্ধারকোঠা বিগ্রহ মন্দিরের দিকে। ছুটির দিনগুলোতে এ বাড়িটি দেখতে অসংখ্য দর্শনার্থী আসে। জেনে নেওয়া যাক এ বিগ্রহের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

আন্ধারকোঠা বিগ্রহ মন্দির
বিশাল একটা দিঘীর পাড়ে দুই তলা বিশিষ্ট এই আন্ধারকোঠা বিগ্রহ মন্দিরে। অনেকগুলো কুঠুরি আছে নিচ তলায়। খা খা দুপুর, চারদিকে সুনশান নিরবতা। অনেকে এটিকে খেলারাম -এর বিগ্রহ মন্দিরও বলে থাকেন। বিগ্রহটি নিয়ে একটা লোককাহিনী প্রচলিত। বিগ্রহটি ছিল পাঁচতলা। এক রাতে তিনটি তলা দেবে যায় মাটির নিচে। জনশ্রুতি রয়েছে, খেলারাম ধনীদের ধনদৌলত ডাকাতি করে গরিবদের মাঝে দান করতেন। এ বাড়ি থেকে একটি সুড়ঙ্গ পথ ছিলো ইছামতি নদীর পাড়ে। নদীপথে ধন সম্পদ এনে এ সুড়ঙ্গ পথে বাড়িতে নিয়ে আসতেন খেলারাম।
এছাড়া এই বিগ্রহের পাশে যে বিশাল বিরাট পুকুরটি রয়েছে লোকমুখে প্রচলিত, মাকে বাঁচাতে খেলারাম সেই পুকুরে নেমে ছিলেন আর উঠে আসেননি। এই পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ কিছু চাইলে তার ইচ্ছা পূরণ হতো বলে সে সময়ের মানুষ বিশ্বাস করতো।
সেটা শেষ করে চললাম কোকিল পেয়ারি জমিদার বাড়ির দিকে। ঘুরেফিরে কয়েকটি ছবি তুললাম। জেনে নেওয়া যাক এ বাড়ির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ি
ঐতিহাসিক কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়িটি নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপায় ইছামতি নদীর তীরে অবস্থিত। প্রায় ২০০ বছর পূর্বে ১৮০০ শতকে চার একর জমিতে জমিদার ব্রজেন রায় এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। ব্রজেন রায় নামের পাশাপাশি তিনি সুদর্শন রায় হিসেবেও সমান পরিচিত ছিলেন। নান্দনিক বাগানে ঘেরা ইট, সুরকি ও রডের ব্যবহারে নির্মিত অপরূপ নির্মাণশৈলীর জমিদার বাড়িটিকে ‘ব্রজ নিকেতন’ নাম দেয়া হয়। কালক্রমে কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ির মালিকানা প্রথমে একজন তেল ব্যবসাহী ও পরবর্তীতে একজন জজের কাছে চলে যায়। তাই জমিদার বাড়ির ইতিহাসের সাথে ‘তেলিবাড়ি’ ও ‘জজবাড়ি’ নাম দুইটি যুক্ত হয়।
কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ির ৫০০ গজের মধ্যে আছে বৌদ্ধ মন্দির, শ্রীলোকনাথ সাহা বাড়ি, কলাকোপা আনসার ক্যাম্প, উকিল বাড়ি, দাস বাড়ি, আদনান প্যালেস এবং ইছামতী নদী। আবার অনেকের মতে এই সবগুলো স্থাপনা কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ির অংশ। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটি কলাকোপা কোকিল প্যারি হাই স্কুলের শিক্ষক আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

রানির পবিত্র জপমালা গীর্জা
নবাবগঞ্জের পথে পান্থরে হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে যাই একটি গির্জা, গির্জাটি অভিবক্ত বাংলা অঞ্চলের প্রথম। গীর্জাটির নাম- ‘রানির পবিত্র জপমালা গীর্জা।’ বুড়িগঙ্গা দিয়ে পর্তুগিজরা যখন বাংলায় আসে, সেই সময়কার ১৭৭০-৭৬ সালে নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা ইউনিয়নের হাসনাবাদ ও আশপাশের গ্রামে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতে শুরু করেন, তার কিছুদিন পরেই ১৭৭৭ সালে ফাদার রাফায়েল গমেজ নামে এক যাজক গির্জাটি প্রতিষ্ঠা করেন।
গির্জায় প্রবেশমুখে দেখা যায়, একদল লোক খাটিয়ায় করে এক মৃত মানুষকে বহন করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। পেছনে পেছনে কিছু মানুষ হৃদয় ভেঙে কান্না করছেন। কিছু মানুষ নীরবে। আর চার্চে বাজছিল মৃত্যুঘণ্টা। এ দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হই। মানুষের চিরকালের বিদায় দেখি। বুকভাঙ্গা আর্তনাদ দেখি।

সবার সাথে আমিও গীর্জার প্রার্থনাঘরে প্রবেশ করি। দেখা যায়, কিছু মানুষ মৃত মানুষটির জন্য প্রার্থনা করছেন আর ‘হাসনাবাদ মিশন সম্মিলিত গানের দল’ এর শিল্পীরা মা মরিয়মের উদ্দেশ্যে একটি প্রার্থনাসঙ্গীত। গানের কথাগুলো এমন- ‘ধন্য মেরী রাণী, ঈশ্বর জননী, ধন্য মেরী রাণী।’
ইছামতি নদীর তীরে রয়েছে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। যেমন গান্ধী মাঠ, আর এন হাউজ, জগবন্ধু সাহা হাউস ও মৈনটঘাট, যাকে মিনি কক্সবাজার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রাজধানীর পাশে একদিনে ঘুরে আসতে পারেন ইতিহাস-ঐতিহ্যের দোহার-নবাবগঞ্জ।








