চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ১ বছর পূর্তি চলছে দেশব্যাপী। বিশ্ব ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থান বরাবরই পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি। কখনো তা ছিল উপনিবেশবিরোধী লড়াই, কখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, আবার কখনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা জনতার কণ্ঠস্বর। এই অনন্য সময়গুলোকে স্মরণ করে দুনিয়ায় বহু দারুণ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যেগুলো শুধু বিনোদন নয় বরং ইতিহাস ও প্রতিবাদের জীবন্ত দলিল।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের বছরপূর্তির দিনে নিচে রইল গণঅভ্যুত্থান ভিত্তিক বিশ্বের আলোচিত কিছু সিনেমা-
ভি ফর ভেন্ডেটা
এক ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতা দখল করে আছে, যেখানে মানুষের কোন অধিকার নেই। সরকার বিরোধীরা সবাই জেলে, যাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে। ঠিক এসময় আবির্ভাব ঘটে এক নৈরাজ্যবাদী যোদ্ধার। যার নাম ‘ভি’! যে একটি বিপ্লব গড়ে তোলে তার নানা প্রচেষ্টার মাধ্যমে। নিপীড়িত মানুষের মুক্তি ঘটে। এমন এক কাল্পনিক অথচ প্রতীকী রাষ্ট্রের কথাই আছে ‘ভি ফর ভেন্ডেটা’ সিনেমায়! একজন মুখোশধারীর নেতৃত্বে জনগণ যখন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়— তখন গড়ে ওঠে এক বিপ্লবের মহাকাব্য। সিনেমায় ‘রিমেম্বার, রিমেম্বার দ্য ফিফথ অব নভেম্বর’- এই সংলাপ বহু আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে! জেমস তেইগুই পরিচালিত এই সিনেমায় হুগো ওয়েভিং এবং নাটালি পোর্টম্যান অনবদ্য অভিনয় করেন।
দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ার্স
বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সিনেমা বলা হয় ১৯৬৬ সালে নির্মিত ‘দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ার্স’-কে। আলজেরিয়ার জনগণের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই, শহুরে গেরিলা যুদ্ধ, এবং বিপ্লবী সংগঠনের জটিলতা নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ২৭তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পুরস্কার ‘গোল্ডেন লায়ন’ ও জিতেছিলো এই সিনেমা। অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র, সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য এবং সেরা পরিচালক হিসেবে মনোনীত হয়েছিলো।
নো
২০১২ সালের একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ড্রামা চলচ্চিত্র ‘নো’। যেটি পরিচালনা করেছেন পাবলো লারেইন এবং চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে আন্তোনিও স্কারমেতার অপ্রকাশিত একটি মঞ্চনাটক অবলম্বনে। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র রেনে সাভেদ্রা (ভূমিকায় গায়েল গার্সিয়া বারনাল) একজন বিজ্ঞাপন নির্বাহী, যিনি ১৯৮৮ সালে চিলিতে স্বৈরশাসক অগুস্তো পিনোচেটের বিরুদ্ধে আয়োজিত এক ঐতিহাসিক গণভোটের প্রচারণায় ‘নো’ পক্ষের হয়ে কাজ করেন। যেখানে দেশের জনগণকে ভোট দিতে বলা হয়, পিনোচেট আরও ৮ বছর ক্ষমতায় থাকবে কি না! রেনে রাজনৈতিক শ্লোগানের বদলে এক নতুন কৌশল নেন- ভবিষ্যতের আশাবাদী চিত্র, আনন্দ ও আশা দেখিয়ে জনগণের মন জয় করার চেষ্টা। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, নজরদারি ও সেন্সরশিপের মাঝেও এই সৃজনশীল প্রচারণা অবশেষে সফল হয় এবং স্বৈরশাসক পিনোচেটকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে।
বাস্তব ঘটনার ওপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি গণতন্ত্র, মিডিয়ার শক্তি এবং সৃজনশীল প্রতিরোধের এক অনন্য উদাহরণ। ‘নো’ ছিল প্রথম চিলিয়ান চলচ্চিত্র যা অস্কারের সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায়, এবং এখনো এটি বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী ও প্রাসঙ্গিক চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত।
লা মিজারেবলস (২০১৯)
সামাজিক বাস্তবতা ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠকে তুলে ধরার জন্য ‘লা মিজারেবলস’ সবসময়ই একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তীব্র রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। এটি ফরাসি ক্রাইম থ্রিলার চলচ্চিত্র, যা পরিচালনা করেছেন লাজ লি। ২০১৭ সালের একই নামে নিজের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সিনেমা, যার পটভূমি প্যারিসের উপশহর মঁফেরমেই- যেখানে ভিক্টর হুগোর ক্লাসিক উপন্যাস ‘লা মিজারেবলস’-এর ঘটনাবলীর একটি অংশও ঘটেছিল। সিনেমার কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়ে, একটি কিশোরের কাছ থেকে ড্রোন চুরির ঘটনায়, যা ধীরে ধীরে পুরো এলাকায় বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি করে। এই ঘটনা মূলত বাস্তব জীবন থেকে অনুপ্রাণিত, ২০০৮ সালে মঁফেরমেই এলাকায় পুলিশি সহিংসতার এক ঘটনা, যা পরিচালক লাজ লি নিজেই প্রত্যক্ষ করে ক্যামেরায় ধারণ করেন। সিনেমাটি তুলে ধরে কীভাবে উপনিবেশ-উত্তর অভিবাসী পরিবার, বিশেষ করে আফ্রিকান ও আরব বংশোদ্ভূত দরিদ্র কিশোরেরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকে। এতে সামাজিক বৈষম্য, পুলিশি বর্বরতা, ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ফুটে উঠেছে।
এই চলচ্চিত্রটি ২০১৯ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্বপ্রিমিয়ার হয় এবং জুরি প্রাইজ অর্জন করে। পরে ফ্রান্সে মুক্তি পায় ২০ নভেম্বর ২০১৯-এ এবং সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। এটি সিজার অ্যাওয়ার্ডস-এ সর্বোচ্চ ১২টি বিভাগে মনোনয়ন পায় এবং সেরা চলচ্চিত্রসহ ৪টি বিভাগে জয়ী হয়। এছাড়া এটি ৯২তম অস্কারে ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ‘সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র’ বিভাগে মনোনীত হয়।
পারসেপোলিস
পারসেপোলিস, প্রাচীন পারস্যের রাজধানী শহর। যা এখানে প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। গল্পটি এক কিশোরী মেয়ের বেড়ে ওঠার কাহিনি, যার শৈশব ও কৈশোর কেটে যায় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পটভূমিতে। পরিবার, সমাজ, রাজনীতি এবং নিজস্ব পরিচয়ের দ্বন্দ্বের মাঝে তার আত্ম-অনুসন্ধানের যাত্রা তুলে ধরা হয় এই চলচ্চিত্রে। ইরানি বিপ্লব ও পরবর্তী ইসলামিক শাসনের সামাজিক প্রভাবকে তুলে ধরা হয় এক কিশোরীর দৃষ্টিকোণ থেকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নারীর অবস্থান- সবই উঠে আসে এই অসাধারণ অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রে।








