বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় প্রশ্ন জোরালোভাবে সামনে এসেছে। যে নারীরা রাজপথের আন্দোলনে, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কিংবা সামাজিক পরিবর্তনের দাবিতে প্রথম সারিতে অবস্থান করেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলকেন্দ্রে বা সংসদে তাদের উপস্থিতি এত নগণ্য কেন?
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনোত্তর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সাম্প্রতিক সময়ের কথা বলতে গেলে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানেও নারীরা কেবল অংশই নেননি, বরং সংগঠক ও সমন্বয়ক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু যখনই নির্বাচন, রাজনৈতিক মনোনয়ন বা রাষ্ট্রকাঠামোর নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সময় আসে, তখন নারীদের সুকৌশলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক একটি জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা ছিল গত পঁচিশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য চরম হতাশাজনক চিত্র হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সংসদে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা থাকলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই যুক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তাদের মতে, সংরক্ষিত আসন রাজনীতিতে নারীর সাময়িক দৃশ্যমানতা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা নীতিনির্ধারণী প্রভাব বিস্তারে এটি মোটেও যথেষ্ট নয়। প্রকৃত নেতৃত্ব গড়ে ওঠে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন, ভোটের মাঠে জয়লাভ এবং জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট অর্জনের মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ডে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নারীরা ভোটাধিকার পেলেও, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে নারীদের দশকের পর দশক লড়াই করতে হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বেও নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান হতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নারী প্রার্থীর হার গড়ে মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অনেক প্রথম সারির রাজনৈতিক দল কোনো নারী প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেয়নি। এর পেছনে দলগুলোর মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা কাজ করে যে, নারী প্রার্থী দিলে নির্বাচনে জয়লাভ করা কঠিন। এই মনোনয়ন-সংস্কৃতিতেই নারীরা প্রথম ধাপেই বাদ পড়ে যান।

নারীদের কেন মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হচ্ছে, এর পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত নানা বাধা চিহ্নিত করেছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে অন্যতম বড় বাধা হলো রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক গবেষণা ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে লিঙ্গীয় সমতা আনার উদ্যোগগুলোকেও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই বৈরী পরিবেশের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সরাসরি নির্বাচনে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক দলেই কোনো নারী প্রার্থী থাকে না। কোথাও কোথাও ধর্মীয় বা সামাজিক রক্ষণশীলতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
শারীরিক নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি বর্তমান যুগে নারী রাজনীতিকদের জন্য একটি ভয়ংকর বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল স্পেস বা সাইবার জগৎ। রাজনীতিতে যুক্ত নারীদের অনলাইনে হয়রানি ও সাইবার বুলিং এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এর মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনীতিতে সক্রিয় নারীদের প্রায় আটচল্লিশ শতাংশ অনলাইনে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, চরিত্রহনন এবং ট্রোলিংয়ের শিকার হন। বাংলাদেশে এর রূপ আরও ভয়াবহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী রাজনীতিক বা নারী অধিকারকর্মীদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ সাইবার আক্রমণ চালানো হয়।

তাদের ছবি বিকৃত করে ছড়ানো বা ডিপফেক তৈরি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, ধর্ষণের হুমকি এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলোও বারবার সতর্ক করেছে যে, সাইবার বুলিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই বিষাক্ত পরিবেশ তরুণ ও মেধাবী নারীদের রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দেয়াল তৈরি করছে।
একজন পুরুষ রাজনীতিকের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে যেখানে সমালোচনা হয়, সেখানে একজন নারী রাজনীতিকের ক্ষেত্রে আক্রমণটা হয় সরাসরি তার নারীসত্তা ও চরিত্রের ওপর। এই অনলাইন সন্ত্রাস নারীদের সামাজিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলে এবং অনেক প্রতিশ্রুতিশীল নারী রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করার আগেই পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য চোখে পড়ে যখন আন্দোলনের নারী আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নারীর তুলনা করা হয়। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নারীরা যেভাবে সামনের সারিতে ছিলেন, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক রূপরেখা বা বিভিন্ন কমিশন গঠনের সময় তাদের সেভাবে রাখা হয়নি। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের আলোচনায় দলগুলো নিজ নিজ দল থেকে অন্তত পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হলেও, বাস্তবে তার কোনো শক্তিশালী প্রয়োগ বা সদিচ্ছা দেখা যায়নি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক জেন্ডার গ্যাপ প্রতিবেদন বলছে, সংসদে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি বাড়লে দেশের অর্থনীতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।

সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় নারীর সংখ্যা কম থাকলে নীতি প্রণয়ন একপেশে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে নারীদের এখনো মূলত স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা নারী ও শিশুবিষয়ক, অর্থাৎ তথাকথিত সামাজিক খাতেই আটকে রাখা হয়। কৌশলগত বা সামষ্টিক অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তাদের নেতৃত্ব প্রায় অনুপস্থিত। অনেক দলীয় কাঠামোতেও নারীকে কেবল অভ্যন্তরীণ সজ্জা হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিডও সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও কাঠামোগত এই বৈষম্যগুলো এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান।
অর্থনীতিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রেও নারীদের বঞ্চনার চিত্র একই রকম। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই শিল্পের মূল কারিগর নারী হলেও ব্যবস্থাপনা বা নেতৃত্বের পদে তাদের উপস্থিতি খুবই কম। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত কিছু পাইলট প্রকল্পে নারী শ্রমিকদের নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর দেখা গেছে, অনেক নারী সুপারভাইজার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং তাদের নেতৃত্বে কারখানার উৎপাদনশীলতাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থাৎ, সুযোগ ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে নারীরা যে সমান দক্ষতায় নেতৃত্ব দিতে পারেন, এটি তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। তা সত্ত্বেও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আস্থার সংকট বিরাজমান। অনেক সময় নারী ভোটাররাও আরেকজন নারী প্রার্থীর ওপর আস্থা রাখতে দ্বিধা করেন। তারা ভাবেন, নারী প্রার্থী হয়তো রাজনৈতিক চাপ সামলাতে বা দর-কষাকষি করতে পারবেন না। এই আস্থার সংকট দূর করতে নারী নেতৃত্বের সফল উদাহরণগুলো বেশি করে সামনে আনা প্রয়োজন। গবেষণা বলছে, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়লে পরিবার, শিশু, সমাজ সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয় এবং একজন নারীর শক্তিশালী নেতৃত্ব অন্য নারীর মাঝেও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানের পথ খুব একটা জটিল নয়, প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপের। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোকে আইন অনুযায়ী তেত্রিশ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে তা পঞ্চাশ শতাংশে উন্নীত করার সুস্পষ্ট রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতিমালা এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির সঙ্গে এই লক্ষ্য সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনকে একটি ভীতিহীন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা, সাইবার বুলিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এর পাশাপাশি নারী নেত্রীদের জন্য আধুনিক রাজনীতি, গণসংযোগ, মিডিয়া সামলানো এবং নীতিপাঠের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শক্তিশালী গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে বা নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মাধ্যমেই নিশ্চিত হয় না; রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ধাপে সব নাগরিকের সমান অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই তা সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর বৈশ্বিক বার্তা ‘রাইটস, জাস্টিস, অ্যাকশন: ফর অল উইমেন অ্যান্ড গার্লস’ বা “আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার” আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, অধিকার আদায় করতে হলে নারীকে নিজেকেই জায়গা করে নিতে হবে এবং রাষ্ট্রকে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
রাজনীতির মাঠে বা সংসদে নারীর উপস্থিতি তাই কেবল নারীর একক অধিকারের বিষয় নয়, এটি দেশের অগ্রগতি, টেকসই উন্নয়ন, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের সামষ্টিক দায়বদ্ধতা।







