নারীদের অধিকার, সামাজিক মর্যাদা কিংবা সমতা নিয়ে নিয়মিত লড়াই করেছেন সমাজের বহু পুরুষ। তবে পুরুষের অধিকার নিয়ে কতজন নারীই বা লড়েছেন। তবে কলকাতার নন্দিনীসহ বিশ্বব্যাপী এমন কিছু মুখ রয়েছে যারা কথা বলেছেন, পুরুষের অধিকার নিয়ে।
মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসে এমন কিছু নারীর গল্প, যারা সংগ্রাম করেছে পুরুষের অধিকার নিয়ে।
কলকাতা লাগোয়া দমদমের বাসিন্দা তুহিন ভট্টাচার্য, তার বাড়ির কাছেই রেললাইন। যেখানে তিনি ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিতে গিয়েছিলেন। তিনি এর আগে আরও দুবার চেষ্টা করেছেন নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার। কিন্তু পারেননি। ফিরে এসেছেন প্রতিবারই।
ভট্টাচার্য বলেন, বৈবাহিক জীবনের সেই চরম অশান্ত সময়ে আমি পাশে পেয়েছিলাম দুজন নারীকে। একজন আমার মা, আরেকজন আমার দিদি। আর আরও পরে পেয়েছিলাম নন্দিনী দি-কে।
এই ‘নন্দিনী-দি’ হলেন নন্দিনী ভট্টাচার্য, অল বেঙ্গল মেনস্ ফোরামের প্রধান। একজন নারী হয়েও তিনি পুরুষদের অধিকারের লড়াই লড়ছেন অনেক বছর ধরে।
ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক জেরোম তিলকসিং বলেন, নন্দিনীর মতো বিভিন্ন দেশের ১৪জন নারীকে বিশ্ব পুরুষ দিবসের ‘দূত’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছি।
অধ্যাপক তিলকসিংয়ের উদ্যোগেই সেই ১৯৯৯ সাল থেকে ১৯ নভেম্বর দিনটি ‘বিশ্ব পুরুষ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তাকেই মনে করা হয়ে থাকে সারা বিশ্বে পুরুষদের অধিকার আন্দোলনের অভিভাবক। তিনি বলছিলেন, গত ২৫ বছর ধরে বিশ্ব পুরুষ দিবস চেষ্টা করে আসছে পুরুষরা যাতে বিভিন্ন ধরণের বাধা অতিক্রম করতে পারেন, মানসিক আঘাত সামলিয়ে উঠতে পারেন। যে সব পুরুষ একা বা প্রান্তিক বোধ করেন, তাদের পাশে আমরা নানা ভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে থাকি।
অধ্যাপক তিলকসিং বলেন, দু:খজনক হলেও এটা ঘটনা যে বিশ্ব পুরুষ দিবসটি কিন্তু জাতি সংঘের কোনও স্বীকৃতি পায়নি। আমরা একাধিকবার চেষ্টা করেছি। বিশ্ব নারী দিবস স্বীকৃতি পেলেও আমরা কোনও স্বীকৃতি পাইনি।
যেসকল নারী ‘পুরুষ-অধিকার’ নিয়ে আন্দোলনে ছিলেন
আফ্রিকার রোজম্যারি
কিনিয়ার পুরুষ অধিকার আন্দোলনের অন্যতম মুখ রোজম্যারি মুথোনি কিনুথিয়া। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আফ্রিকান ‘বয় চাইল্ড নেটওয়ার্ক’ এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক তিনি।
নাইরোবি থেকে কিনুথিয়া বলছিলেন, আমার ছোটবেলা কেটেছে বাবা আর দুই ভাইয়ের সান্নিধ্যে। মা অন্য জায়গায় থাকতেন। যে অঞ্চলে আমি বড় হয়েছি, সেটা নানা ধরণের অপরাধমূলক কাজের জন্য কুখ্যাত ছিল।
তিনি বলেন, আমারা বাবা মারা যান ২০১৬ সালে। কাজ থেকে অবসর নেওয়ার পরে তাকে যে মানসিক অশান্তির মধ্যে দিয়ে হয়েছে, সেটা আমি দেখেছি কাছ থেকে। আফ্রিকায় পুরুষরা তো কখনও মুখ ফুটে বলে না তাদের মানসিক যন্ত্রণার কথা। তাই বাবা চলে যাওয়ার বছরেই আমি ঠিক করি যে পুরুষদের জন্য কিছু করতে হবে আমাকে। চাকরি ছেড়ে দিই আমি।
দিল্লির দীপিকা
দিল্লির বাসিন্দা দীপিকা নারায়ণ ভরদ্বাজ একজন সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা। তিনি বলেন, পুরুষ অধিকার আন্দোলনে আমরা জড়িয়ে পড়া একটা ব্যক্তিগত ঘটনার মাধ্যমে।
তিনি বলেন, আমার এক কাজিনের বিয়েটা ভেঙ্গে যায় মাত্র মাস তিনেকের মধ্যে। তার সেই সাবেক স্ত্রী আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে বধূ-নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন। এমন কি আমিও নাকি তাকে নিয়মিত মারধর করতাম, এরকম মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়।
দীপিকা নারায়ণ ভরদ্বাজ বলেন, আদালতের বাইরে অনেক অর্থ দিয়ে সেই বিষয়টি আমরা মিটিয়ে নিই। ওই মামলার ব্যাপারেই আমি যখন নানা জায়গায় যাতায়াত করি, তখনই বুঝতে পারি যে পুরুষরা যখন নির্যাতনের শিকার হবেন, তাদের জন্য সেরকম কোনও আইনি সুরক্ষাই নেই! সেই থেকেই আমার কাজের শুরু। ‘মার্টার্স অফ ম্যারেজ’ (বিবাহের শহীদ) নামে আমি একটি তথ্যচিত্র তৈরি করি। সেখানে বধূ-নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগে কীভাবে বহু পুরুষের জীবন শেষ হয়ে গেছে, সেই কাহিনী তুলে ধরেছিলাম।
কলকাতার নন্দিনী
অল বেঙ্গল মেনস্ ফোরামের প্রধান নন্দিনী ভট্টাচার্য বলেন, আমি অবশ্য কোনও ব্যক্তিগত ঘটনার কারণে এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়িনি।
তার কথায়, আমার চারপাশে সব সময়ে নানা ঘটনা দেখতাম যা থেকে আমার মনে হত যে পুরুষদের অবস্থাটা বেশ সঙ্গিন। প্রথমে তারা তো মা এবং স্ত্রীর চাপে একটা খুব দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় থাকেন। এরপর তার যদি পুত্র সন্তান থাকে, তার বিয়ের পরে যখন সেই পুরুষটি শ্বশুর হন, তখন নিজের স্ত্রী এবং পুত্রবধূর চাপ পড়ে পরিবারের প্রধান পুরুষটির ওপরে।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই যেন বিনা দোষে দোষী বলে দাগিয়ে দেওয়া হয় পুরুষদের। যেমন ভিড় বাসে যদি ঝাঁকুনির কারণেও কোনও নারীর গায়ে ছোঁয়া লাগে, তাহলে তিনি ভেবে নেবেন যে পুরুষটি তার শরীর ছুঁতে চাইছেন। অফিসে কোনও নারীকে যদি কিছু বলেন আমি এটাই দেখে এসেছি যে পুরুষটি জনরোষের শিকার হয়ে যান। ভীষণ একপেশে মনে হত ব্যাপারটা। সমাজে, চারপাশে এগুলো দেখতে দেখতেই আমার পুরুষ অধিকার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া।
নারী হয়েও কেন পুরুষদের জন্য লড়াই?
তথ্যচিত্র নির্মাতা ও ভারতে পুরুষ অধিকার আন্দোলনের অন্যতম মুখ দীপিকা নারায়ণ ভরদ্বাজ বলছিলেন, আমি ২০১২ সালে প্রথম কাজ করতে শুরু করি পুরুষদের অধিকার নিয়ে, তখন অনেকেই আমাকে এই কথাটা জিজ্ঞাসা করতেন যে একজন নারী হয়ে আমি কেন পুরুষদের হয়ে লড়ছি। এখন অবস্থাটা অনেকটা বদলিয়েছে। কিন্তু এখনও আমার মতো কেউ পুরুষদের অধিকার নিয়ে কথা বলছে, এমন নারীর সংখ্যা আপনি হাতে গুনতে পারবেন।
তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে বহু পুরুষও কিন্তু দশকের পর দশক ধরে নারী-অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, আন্দোলনে নেমেছেন। তার কথায়, কোনও নারীর ওপরে নির্যাতন হলে যেমন বহু পুরুষ এগিয়ে এসেছেন, তেমনই কোনও পুরুষের ওপরে নির্যাতন হলে এগিয়ে আসা, প্রতিবাদ করা তো নারী হিসেবে আমাদেরও কর্তব্য।
এই একই ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে অন্যান্য নারীদেরও, যারা পুরুষ অধিকার আন্দোলনে এগিয়ে এসেছেন।
কেনিয়ার রোজম্যারি কিনুথিয়া বলছিলেন, এবছরের বিশ্ব পুরুষ দিবস উপলক্ষে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার একটা ভাষণ আছে ১৯ নভেম্বর। সেটার পোস্টার আমি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করতেই নারীবাদীরা আমাকে সাংঘাতিক ট্রল করতে শুরু করলেন। তারা প্রশ্ন তুললেন যে একজন নারী হয়ে আমি কীভাবে পুরুষদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারি! পুরুষদের ব্যাপারে আমি কীইবা বুঝি! অথচ ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীরা নন, পুরুষরাই আমাকে ভাষণ দেওয়ার জন্য ডেকে নিয়েছিলেন।
বিশ্ব পুরুষ আন্দোলনের প্রধান অভিভাবক অধ্যাপক জেরোম তিলকসিং বলছিলেন, আমাদের সঙ্গে নারীদের তো কোনও বিরোধ নেই! নারী-পুরুষ মিলেই তো একটা পরিবার। ক্যান্সার আক্রান্ত কোনও পুরুষকে তো তার স্ত্রী বা বোনই কিমোথেরাপি দিতে নিয়ে যান! আবার তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটানো কোনও পুরুষকে তো একজন নারী– তিনি স্ত্রী অথবা বান্ধবী যে কেউ হতে পারেন, তিনিই তো সঙ্গ দেন!
এই প্রতিবেদন যার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই তুহিন ভট্টাচার্যের পাশে তো তার মা আর দিদিই দাঁড়িয়েছিলেন!
জেরোম তিলকসিং বলেন, সারা বিশ্বে পুরুষদের বিপক্ষে, একপেশে যে ভাবনাটা, যে ব্যবস্থাটা তৈরি হয়েছে, প্রশাসনিক বলুন বা আইনি– আমরা সেটা বদলাতে চাইছি। নারী-পুরুষ উভয়ের লিঙ্গ-সমতার ভিত্তিতে যাতে একটা সমাজ গড়ে তোলা যায়, একটা সুস্থ পরিবার গড়ে তোলা যায়, আমরা সেটা চাইছি।










