থ্রি-হুইলারগুলো মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। নিয়মিত ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। কিন্তু অবস্থার কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। যেন দেখার কেউ নেই! বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এ নিয়ে টুকটাক কথাবার্তা-লেখালেখি হয়। আবার যা তাই।
বিভিন্ন সূত্রমতে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ২০ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটছে মহাসড়কে অবৈধভাবে চলাচলকারী অটোরিক্সা, ইজিবাইক, নসিমন-করিমনের মতো যানবাহনের কারণে। কিন্তু বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইনে তো বটেই এমনকি মহামান্য হাইকোর্টের রায়েও এসব যানবাহন মহাড়কে চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু কার কথা কে শোনে?
গত ৭ ডিসেম্বর ঝালকাঠি জেলার নলছিটির দপদপিয়া জিরো পয়েন্ট এলাকায় মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় চার জন নিহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বরিশাল থেকে পটুয়াখালীগামী ব্যাপারী পরিবহনের সঙ্গে বরিশালগামী একটি মাহিন্দ্রের (থ্রি-হুইলার) মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় মাহিন্দ্রের ভেতরে থাকা দুই যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পরে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। এরকম দুর্ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। খোঁজ নিলে জানা যায় এর বেশিরভাগই ঘটে মহাসড়কে থ্রি-হুইলারের কারণে।
বিশ্বের আর কোথাও নজির না থাকলেও বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোতে ধীর গতির ছোট ছোট যানবাহন চলাচল করে দেদারছে। জালের মতো চারপাশ থেকে ছোট ছোট পথ এসে
মহসড়কে মিশেছে এমন নজিরও আর কোথায় পাওয়া দুষ্কর। অথচ আমাদের দেশে সাধারণ সড়ক থেকে শুরু করে মহাসড়কে এমনকি সংরক্ষিত সেতু এলাকায়ও অবাধে তা চলাচল করছে। এর ফলে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাণহানি হচ্ছে মানুষের। যারা আহত হন, তারা চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান।
আহত-নিহত হওয়া ছাড়াও মহাসড়কে সৃষ্টি হয় যানজট, যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ধীর হয়, সময়ের অপচয় হয়, পরিবহন খরচও বেড়ে যায়। রাতের বেলা এসব যানবাহন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। ঠিকমতো দেখা না যাওয়ায় দ্রুত গতির যানবাহনের সামনে মুহূর্তে চলে আসে। তখন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা যেমন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তেমনি অবধারিতভাবে দুর্ঘটনাও ঘটে।
এসব যানবাহন যারা চালায় এদের বেশিরভাগই ড্রাইভিং সম্পর্কে কোনো প্রশিক্ষণ নেই। নেই ট্রাফিক সিগন্যাল সম্পর্কে ন্যুনতম ধারণা। তাই খেয়াল খুশি মতো মহাসড়কে যাচ্ছেতাই অবস্থা সৃষ্টি করছে। যত্র তত্র ব্রেক করছে, টার্ন নিচ্ছে যখন- তখন। পেছনে কোনো দ্রুতগতির যানবাহন আসছে কিনা খেয়ালও করছে না। এছাড়া এসব থ্রি হুইলারের বেশিরভাগই রেজিস্ট্রেশনবিহীন। ফিটনেসতো দূরের কথা সিগনাল লাইট, পার্কিং লাইট, পাসিং লাইট এমনকি লুকিং গ্লাসের মত অত্যাবশ্যকীয় জিনিসগুলো দেখা যায় না অনেক সময়। ফলে অবধারিতভাবেই ঘটছে দুর্ঘটনা।
অনেকে যুক্তি দিয়ে থাকেন এসব থ্রি হুইলার বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে অনেকের জীবিকা জড়িত। সেটা অবশ্যই ঠিক আছে। এ জন্য স্থানীয় সড়কে এগুলো চলতে বাধা নেই। সবগুলো যানবাহনকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনে গ্রাম-মফস্বলের হাট-বাজার-বাসস্টান্ডে যাতায়ত বা স্থানীয় পরিবহনের কাজে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে
এসব যানবাহন স্থানীয় জনগণের উপকারে আসে। এসব এলাকায় চালালে জীবিকা নির্বাহে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন এরা মহাসড়কে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ঘটায় দুর্ঘটনা।
জ্বালনি ও বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে সারা দেশের লাখ লাখ এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ খোয়া যাচ্ছে। এতে বিদ্যুতে যেমন টান ধরছে, তেমনি গ্রাহকদের লোডশেডিংয়ের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এসব ধীর গতির ছোট যানবাহন উভয় দিক থেকেই মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বিদ্যুৎ সাবাড় করে দিচ্ছে, অন্যদিকে সড়ক-মহাসড়কে মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে প্রাণহানি ঘটাচ্ছে।
এটা এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে, সড়ক-মহাসড়কে উৎপীড়ক হয়ে থাকা থ্রি হুইলার অটোরিকসা, অটোটেম্পো, অযান্ত্রিক যানবাহন দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ এবং তা ঘটিয়ে চলেছে। এমনিতেই চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটছে। তার উপর এসব যানবাহন যুক্ত হয়ে দুর্ঘটনার হার বাড়িয়ে দেবে, তা হতে পারে না। অবিলম্বে সড়ক-মহাসড়ক থেকে ধীরগতির ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। সড়ক-মহাসড়ককে নিট অ্যান্ড ক্লিন ও নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঢিলেমি বা গাফিলতি অগ্রহনযোগ্য।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







