বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সবকিছুতেই ইসরায়েলের প্রতি রয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। ইহুদি রাষ্ট্রটির সবথেকে কাছের বন্ধু হিসেবেই বিবেচনা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন কাউকেই দেখা যায়নি ইসরায়েলের বিপক্ষে যেতে। তবে সম্প্রতি দেশটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব। যে দেশটির সবসময় কাজ করে আসছে ইসরায়েলের পক্ষের শক্তি হিসেবে, সেদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব অনেকটাই অবিশ্বাস্য!
তবে যে প্রশ্নটি বেশি ভাবাচ্ছে দেশটিকে তা হল, কেনই বা এতটা ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব দেখা দিয়েছে তাদের মধ্য। দেশটির আইনপ্রণেতা থেকে শুরু করে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, শুধু মাত্র শিক্ষার্থীরাই কি এই বিক্ষোভ পরিচালনা করছে, নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কেউ।
গত ৭ অক্টোবর গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। ৭ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই হামলায় নিহত হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি। এদের মধ্য বেশিরভাগই শিশু ও নারী। অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় দিন পার করছেন সেখানকার বাসিন্দারা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অঞ্চলটিতে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের কথা। শিক্ষার্থীদের এমন মনোভাবের শুরুটা এখান থেকেই। তাদের দাবি, ইসরায়েল এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করুক। দেশটির সরকার যেন ইসরায়েলের প্রতি তাদের সমর্থন বন্ধ করে দেয়।

আন্দোলন রুখে দিতে শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ, গণহারে গ্রেপ্তার, বহিষ্কার, নারী অধ্যাপককে মাটিতে ফেলে হাতকড়া পরানো, আবাসিক সুবিধা কেড়ে নেওয়া, স্কলারশিপ বাতিলের মতো ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু তারপরও থামছে না এই বিক্ষোভ।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৮ এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ফিলিস্তিনে গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ৮০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। এক শিক্ষার্থী বলেছেন, এটি একটি ছাত্র বিপ্লব।
বিক্ষোভের শুরুটা হয়, গত ১৭ এপ্রিল ভোরে যখন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী তাঁবু খাটিয়ে দাবি আদায়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। পরদিন এই আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয় আন্দোলনকারীদের। এসময় শতাধিক শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। এরপর এই বিক্ষোভ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পরতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

শিক্ষার্থীদের মূল দাবি হল, ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে এমন করপোরেশনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কারা বিনিয়োগ করছে তাদের তথ্য প্রকাশ, ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামগুলোর সঙ্গে একাডেমিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। ইসরায়েলের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নেওয়া ও ইসরায়েলে বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে।
এছাড়াও সম্প্রতি ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আটক-হয়রানি বন্ধ করতে হবে। আটকদের মুক্তি দিতে হবে ও আন্দোলনকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ফিলিস্তিনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল বাহিনী। ফিলিস্তিনের ৮০ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। শিক্ষক- অধ্যাপকসহ হাজার হাজার শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। আর আমরা তাতে বাঁধা না দিয়ে সমর্থন জানাচ্ছি।
শিক্ষার্থী মনে করছেন, এই হামলাগুলো ফিলিস্তিনি সমাজের ভিত্তিকে ভেঙে ফেলার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হচ্ছে। আর এটির ধ্বংসে আমাদের অস্ত্র-বোমা এবং আমাদের অর্থের ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা এটি রোধ করতে চাই। অনেকেই বলেছেন, আমাদের ইহুদি বিদ্বেষের কারণ হল, সেখানে আমরা অসভ্যতা এবং মূর্খতার উদাহরণ দেখেছি। গাজার দিকে চোখ রেখে কেউ অস্বীকার করে না যে সেখানে অনেক খারাপ ঘটনা ঘটছে।
এই বর্বর হামলায় খোদ ইসরায়েলপন্থী দেশের জনগণ আজ রাস্তায় নেমেছে। বাধা পেলেও শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা বলেছে। তাদের একটাই লক্ষ্য, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।








