আসন্ন গণভোট নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্র্যাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও উন্নয়ন কর্মকর্তা আসিফ সালেহ। তিনি বলেছেন, এই গণভোটে ভোটাররা আসলে কী বিষয়ে সম্মতি দিচ্ছেন, তা পরিষ্কারভাবে বোঝার সুযোগ পাচ্ছেন না।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাত ১টা ১৯ মিনিটে নিজের ফেসবুক পোস্টে আসিফ সালেহ লেখেন, এই গণভোটে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করার মতো বিষয়েও ভোট দেওয়া হচ্ছে, যা তিনি নিজেও আগে জানতেন না। তার ভাষায়, “বাড়ির বুয়া থেকে ব্যারিস্টার বন্ধু পর্যন্ত সবাই এই গণভোট নিয়ে কনফিউসড।”
তিনি জানান, ভোটের দিন আলাদা ব্যালটে গণভোটের জন্য যে প্রশ্নটি রাখা হবে, সেখানে মাত্র চারটি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ থাকবে। ভোটারদের শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে। অথচ এই তথাকথিত ‘জুলাই সনদে’ মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আসিফ সালেহের দাবি, এই ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বাকি ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন শাসনব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো পরিবর্তন, ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর বাধ্যতামূলক ৩০ দফা অঙ্গীকার এবং নতুন একটি উচ্চকক্ষ গঠনের মতো বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত অনুমোদনের কথা বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সব বিষয়কে একত্রে একটি প্রশ্নে বেঁধে দেওয়া মানে ভোটারদের প্রকৃত মতামত জানানোর সুযোগ কেড়ে নেওয়া। কেউ হয়তো কিছু সংস্কারের পক্ষে, আবার কিছু প্রস্তাবের বিপক্ষে। কিন্তু গণভোটের কাঠামোতে সেই ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নেই।
এছাড়া ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেই পরিবর্তন আসবে, এমন প্রচারণাকেও বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করেন আসিফ সালেহ। তিনি বলেন, একটি গণভোট নিজে থেকেই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না; পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক আচরণ, দলীয় সংস্কার, জবাবদিহি এবং সঠিক বাস্তবায়ন। ‘হ্যাঁ’ ভোটকে পরিবর্তনের একমাত্র শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা জনগণের মধ্যে মিথ্যা আশা তৈরি করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পোস্টে তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, এই সংস্কারগুলোর বাস্তবায়নে কত খরচ হবে, সেগুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো আদৌ সমাধান হবে কি না এসব বিষয়ে ভোটারদের কোনো পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়নি। তার আপত্তি অনেক প্রস্তাবের চেয়ে বেশি এই প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা ও তাড়াহুড়োর বিরুদ্ধে।
আসিফ সালেহ বলেন, গণতন্ত্রে সম্মতি তখনই বৈধ, যখন তা বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ভোটাররা যদি না বোঝে, অথচ তাদের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করা হয়, তাহলে সেটি প্রকৃত সম্মতি নয়, কেবল প্রক্রিয়াগত অনুমোদন।
তিনি জানান, ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। প্রথমে প্রস্তাব ছিল, যে বিষয়ে কোনো দলের আপত্তি থাকবে, সেই দল ক্ষমতায় গেলে তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। তবে এই বিষয়ে সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে আগামী সংসদ এই ৮৪টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। আর ‘না’ ভোট জয়ী হলে জুলাই সনদই কার্যকর হবে না। যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সবশেষে তিনি প্রশ্ন রাখেন, বলা হচ্ছে দেশের চাবি আপনার হাতে। কিন্তু আপনি কি সত্যিই জানেন, কোন তালা কোন চাবি দিয়ে খুলতে যাচ্ছেন?







