১৩ মার্চ স্ট্রিমিংয়ের পর বিশ্বব্যাপী নেটফ্লিক্সে সাড়া ফেলে দিয়েছে একটি ব্রিটিশ ওয়েব সিরিজ। এটির নাম ‘অ্যাডোলেসেন্স’। সোমবারের নেটফ্লিক্স ডাটা বলছে, এখনো ৭১টি দেশে নেটফ্লিক্সে ট্রেন্ডিং এক নম্বরে রয়েছে, এবং ৯১টি দেশে শীর্ষ দশে অবস্থান করছে মাত্র ৪ পর্বের এই লিমিটেড সিরিজটি! বাংলাদেশেও নেটফ্লিক্সে এটি আছে নম্বর ওয়ানে!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে নির্মিত এই সিরিজ কেন এতো মানুষ দেখছে, এমন প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এমনকি এর নির্মাতা-প্রযোজকরাও বিশ্বব্যাপী এই সিরিজটির সাড়া দেখে রীতিমত বিস্মিত! বলছেন এটা ছিলো তাদের কল্পনাতীত!
কী আছে বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দেয়া সিরিজটিতে?
১৩ বছর বয়সী স্কুলগামী এক বালক, যার নাম জেমি মিলার এবং তার করা একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘অ্যাডোলেসেন্স’। জেমি মিলার, যে তার সহপাঠী কেটিকে একাধিকবার ছুরি মেরে হত্যা করে। প্রথমে এটি যুক্তরাজ্যে বেড়ে চলা সাধারণ ছুরিকাঘাতজনিত অপরাধগুলোর মতো মনে হতে পারে। তবে এটি শুধু একটি অপরাধের গল্প নয়!
সিরিজটির প্রযোজক ও অভিনেতা স্টিফেন গ্রাহাম বলেন, তিনি কিশোরদের দ্বারা ছুরিকাঘাতের সংবাদ শুনে মর্মাহত হয়েছিলেন। তিনি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন, “আমাদের সমাজে এটা কীভাবে ঘটছে? আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
কিন্তু সিরিজটি যত এগোয়, তত বোঝা যায় যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে জেমির ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মানবোধ, আত্মপরিচয় এবং একাকিত্বের অনুভূতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। জেমি অনলাইনে নির্যাতনের শিকার হয়, নেতিবাচক কনটেন্টে আসক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত এই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটে!
জেমির পরিবার ছিল একটি সাধারণ ব্রিটিশ মধ্যবিত্ত পরিবার। সে ছিল মেধাবী, ভালো ছাত্র, এবং তার পরিবারও তাকে ভালোবাসত। তবু, ডিজিটাল জগৎ তাকে গ্রাস করে ফেলে। এখানেই বড় প্রশ্ন উঠে আসে—আসলে কি অভিভাবকেরা জানেন তাদের সন্তান অনলাইনে কী করছে এবং তা তার মানসিক অবস্থার ওপর কী প্রভাব ফেলছে?
বিশ্বজুড়ে সিরিজটিকে বলা হচ্ছে ‘সমাজের আয়না’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু শিশুদের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে না, অভিভাবকদের জন্যও এটি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সিরিজটি দেখায়, কীভাবে জেমির মা-বাবা তার অনলাইন জীবনের সংকেতগুলো বুঝতে ব্যর্থ হন। এটি বৃহত্তর সমাজে ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে তৈরি হওয়া প্রজন্মগত ব্যবধান এবং অনলাইন নিরাপত্তার অভাব তুলে ধরে।
জেনজি-রা এমন একটি ডিজিটাল ভাষা ও সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত, যা অভিভাবকদের পক্ষে বোঝা কঠিন। ইমোজির মাধ্যমে লুকানো বার্তা, চরমপন্থী আদর্শের প্রতি আকর্ষণ, টক্সিক ম্যাসকিউলিনিটি, নারীবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহিংসতায় আসক্তি—এসব কিছুই যুবকদের মানসিক গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জেমির চরিত্রটি দর্শকদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিশু পরিবারে স্বাভাবিক ও সুখী দেখা গেলেও তারও অভ্যন্তরীণ মানসিক সংকট থাকতে পারে, যা অন্যদের কল্পনারও বাইরে!
সিরিজটি পৃথিবীর জন্য ‘একটি সতর্কবার্তা’
‘অ্যাডোলেসেন্স’ সিরিজটিকে বলা হচ্ছে, অভিভাবকদের জন্য বড় সতর্কবার্তা! শিশুদের হাতে মোবাইল বা ট্যাব ধরিয়ে দিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখার দিন শেষ হওয়া উচিত। ডিজিটাল যুগে মানুষের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলা উচিত। প্রকৃত মানবিক সম্পর্ক মানুষের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে সাহায্য করে, যা প্রযুক্তি কখনোই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
সিরিজটি শুধুমাত্র দুর্দান্ত অভিনয় ও নির্মাণশৈলীর জন্য নয়, এটি সমাজের জন্য একটি জাগরণবার্তা। এটি দেখতে দেখতে যে কারো মনে হতে পারে যে “এটা আপনার সন্তানের সাথেও ঘটতে পারে।” তাই এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি!








