গণঅভ্যুত্থান দিবসে ঢাকায় যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলছিল তখন হঠাৎ করেই খবর এলো প্রথম সারির কয়েকজন সমন্বয়ক কক্সবাজারে একটি হোটেলে অবস্থান করছেন। এরপর থেকেই জনমনে প্রশ্ন জাগে এমন দিনে কী কারণে তারা কক্সবাজার গিয়েছেন?
চ্যানেল আই অনলাইন এনসিপিসহ বিভিন্ন পক্ষের সাথে কথা বলে এই প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সরকারের বিভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বললেও কেউ এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে সরাসরি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
এনসিপির এক নেতা জানান, আমরাও এ বিষয়ে জানার চেষ্টা করছি। এসব নেতারা দলের তেমন কাউকে জানিয়ে কক্সবাজার যাননি। একেকজনের কাছে একেক ধরনের কথা শুনতে পাচ্ছি। তবে আমি যতটুকু জেনেছি, তাতে এটা ব্যক্তিগত ট্যুর বলেই জানা যাচ্ছে। দলীয় কোন ট্যুর নয়।
পিটার হাসের সাথে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমরা খোঁজখবর নিয়েছি এবং মিডিয়ার খবরেও প্রকাশ হয়েছে যে, সাবেক এই মার্কিন রাষ্ট্রদূত দেশে নেই। এটি বিরোধীদের প্রচারিত ভুয়া খবর। পিটার হাসের সাথে বৈঠকের বিষয় থাকলে দল অবশ্যই জানত। এছাড়া পিটার হাসের সাথে গোপন বৈঠকের কিছু নেই। আমাদের দলীয় কার্যক্রমের সবই প্রকাশ্য। গোপন কোন বিষয় নেই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৫৮ সাবেক সমন্বয়কের একাধিক জনের সাথে কথা বলেছে চ্যানেল আই অনলাইন। সেসব সমন্বয়করা বলছেন, জুলাই ঘোষণাপত্র আমরা বয়কট করেছি। এ বিষয়ে ৫ আগস্টের আগেই সব সমন্বয়কের মিটিং হয়েছে। সেখানে ১৩০ জনের বেশি সমন্বয়ক প্রোগ্রাম বয়কটের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, জুলাই ঘোষণাপত্রে শহীদ ও আহতদের চেতনার প্রতিফলন নেই। এছাড়া ১৫৮ জন সমন্বয়ক গণঅভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি হলেও তাদের সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। যেই সমন্বয়করা জীবন বাজি রেখে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদেরকে ঘোষণাপত্রের অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করলে আমরা কেন সেখানে যাব? হান্নান মাসউদসহ প্রায় সবাই ঘোষণা দিয়েই অনুষ্ঠান বয়কট করেছেন। অনুষ্ঠান যেহেতু বয়কট হয়েছে, সেজন্য এনসিপির এসব নেতা ও সাবেক সমন্বয়করা ঢাকার বাইরে যেতেই পারেন। এখানে থাকলে তো তাদেরকে হয়তোবা প্রোগ্রামে যেতেও হতে পারে। সেটি ১৩০ জন সমন্বয়কের সিদ্ধান্তের অবমাননা হবে। এজন্য তারা ঢাকার বাইরে চলে যেতে পারেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের এ কথার সাথে একমত নন ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে উঠে আসা গণঅধিকার পরিষদের এক কেন্দ্রীয় নেতা। গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের এ সদস্য বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের এমন দাবি যৌক্তিক নয়। কারণ, সেসব সমন্বয়কদের কেউ কেউ অনুষ্ঠানে ছিলেন। সম্মিলিতভাবে অনুষ্ঠান বয়কট করে ব্যক্তিগতভাবে সেখানে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান ও সাধারণ সম্পাদকদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রটোকল অনুযায়ী হাসনাত-সারজিসদের দাওয়াত পাওয়ার কথা নয়। সেজন্য তারা দাওয়াত পাননি। কিন্তু এ বিষয়টিকে সম্ভবত তারা ভালোভাবে নেননি। এটা নিয়েই মূলত সমস্যা হয়েছে। এখন তারা যদি সেখানে অংশগ্রহণ করতেনও, তাহলে তাদেরকে দর্শক সারিতে বসতে হতো। দর্শক সারিতে বসে তারা কোন আলোচনায় আসতেন না। এর বদলে ইচ্ছা করেই কক্সবাজারে গিয়ে বহুগুণ বেশি কাভারেজ পেয়েছেন। আমার মনে হয়, তারা আলোচনায় থাকার জন্যই গণঅভ্যুত্থান দিবসে কক্সবাজার গিয়েছেন।
তবে চ্যানেল আই অনলাইনকে এনসিপির একাধিক নেতা এবং সরকারি এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তারা বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম সারির সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমদের মাইনাস করার ষড়যন্ত্র চলছে। ‘ড. ইউনুসের স্বজনপ্রীতির প্রমাণ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা’- জুলাই পদযাত্রায় হাসনাতের এমন বক্তব্যের পর সরকারের সাথেও তাদের দূরত্ব বেড়েছে। এর জেরেই স্বৈরাচার পতনের বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে নিয়ম দেখিয়ে সমন্বয়কদের দাওয়াত দেওয়া হয়নি। সেসব বিষয় নিয়ে অভিমান-দূরত্বের জেরেই গণঅভ্যুত্থান দিবসে তারা ঢাকার বাইরে যেতে পারেন।
উল্লেখ্য, গণঅভ্যুত্থান দিবসে এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী এবং তাসনিম জারাসহ বেশ কয়েকজন নেতার কক্সবাজার যাওয়ার খবর প্রকাশ হওয়ার পর সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সাথে বৈঠকের তথ্যে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও কক্সবাজারের সী পার্ল হোটেলের সামনে জড়ো হন। এসময় নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, পিটার হাসের সাথে বৈঠকের খবর গুজব। আমরা এখানে ঘুরতে এসেছি।
এরপর সী পার্ল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’র চিফ সিকিউরিটি অফিসার লে. কমান্ডার কামরুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমাদের হোটেলে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস তো নয়ই, কোন বিদেশি গেস্ট নাই।








