কোরিয়ানদের মাঝে নিজেদের একটি ছোট কক্ষে বন্দী করার প্রবণতা বেড়েছে। এই ছোট কক্ষটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরি’। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের বাইরের জগৎ থেকে পৃথক করে ফেলছেন। কেবলমাত্র এই ঘরের একটি ছোট ছিদ্রের সাহায্যে তারা বাইরের বিশ্বটাকে উপভোগ করার সুযোগ পায়।
এমনি ছোট ঘর তথা ‘হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরি’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কোরিয়ান সন্তানদের এবং মা-বাবাদের কাছে। যে ঘরটি তাদেরকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয় পৃথিবী থেকে।
এই কক্ষগুলোর ভিতরে কোনও ফোন বা ল্যাপটপ নেওয়ার অনুমতি নেই। চারপাশে দেয়াল দ্বারা আবৃত ঘরটি দেখতে কেবল স্টোর রুমের একটি আলমারির মতো। এখানে ব্যক্তির বন্ধু হিসেবে রয়েছে কেবল দেওয়াল।
এই কক্ষগুলোর বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে আলাদা ইউনিফর্মও, যার রং নীল। এটির অভিজ্ঞতা এবং বর্ণনা শুনতে কারাগারের মতো মনে হলেও এটি ঠিক কারাগার নয়। এখানে মানুষেরা আসে ‘বন্দীর অভিজ্ঞতা’র জন্য, আর বন্দী থাকে বছরের পর বছর।
এখানে বেশিরভাগ লোক শিশুর মতো হয়ে যায়, এমন শিশু যারা সমাজ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তবে এখানে তারা নিজেরা শিখতে আসে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কেমন লাগে।
একাকী-বন্দী কক্ষে
এই একাকী কক্ষে বন্দী বাসিন্দাদের মধ্যে যুবকদের ‘হিকিকোমোরি’ বলা হয়। ১৯৯০ এর দশকে জাপানে কিশোর এবং তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার এক প্রবল আগ্রহ দেখা দিয়েছিল। তখন তাদের জন্য এই শব্দটি ব্যবহার হয়েছিল।
গত বছর সাউথ কোরিয়ার স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, জরিপটি ১৫ হাজার মানুষের মধ্যে হয়েছে, যেখানে সবার বয়স ১৯ থেকে ৩৪ বছর ছিল। এদের মধ্যে ৫ শতাংশের বেশি মানুষ নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখতে পছন্দ করে।
জরিপ পরবর্তী বলা হয়, এই জরিপটি যদি সাউথ কোরিয়ার বৃহত্তর জনসংখ্যার মধ্যে করা হয়, তাহলে অন্তত ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ এই বিচ্ছিন্নতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে বলে মনে করা হবে।
এই বিচ্ছিন্নতার পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
আবেগজনিত কারাগার
জিন ইয়ং-হে এর ছেলে তিন বছর যাবৎ তার ঘুমের-কক্ষে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। ২৪ বছর বয়সী যুবকের এই গৃহবন্দীকে ‘আবেগজনিত কারাগার’ বলে উল্লেখ করেন জিন ইয়ং-হে।
তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছি, কী ভুল করেছি! এটা চিন্তা করাও বেদনাদায়ক। তবে তার গৃহবন্দী এই সময় শুরু হওয়ার পর থেকে আমি স্পষ্ট হতে শুরু করেছি, আমি ঠিক করিনি।’
পার্ক হ্যান-সিল নামের এক অভিভাবক তার ২৬ বছর বয়সী ছেলের জন্য ‘হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরিতে’ আসেন। তার ছেলে সাত বছর আগে বাইরের বিশ্বের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল।
কয়েকবার বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর সে এখন খুব কমই তার ঘর থেকে বের হয়।
মিসেস পার্ক তাকে একজন ‘মাইন্ড কাউন্সেলর’ এর কাছে নিয়ে যান এবং ডাক্তারদের সাথেও যোগাযোগ করেন। কিন্তু তার ছেলে মানসিক-স্বাস্থ্যের ওষুধ সেবন করতে অস্বীকার করেন এবং ভিডিও গেম খেলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
এমন মনোভাবের ফলে তাদের মাঝে বেশ কিছু পার্থক্যও তৈরি হচ্ছে।

যদিও মিসেস পার্ক এখনও তার ছেলের কাছে পৌঁছানোর জন্য লড়াই করছেন, তিনি বিচ্ছিন্নতা প্রোগ্রামের মাধ্যমে তার অনুভূতিগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, আমি বুঝতে পেরেছি যে আমার সন্তানকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষে বন্দি থাকতে বাধ্য না করে তার জীবনকে উপভোগ করতে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কথা বলতে অনীহা
জিন ইয়ং-হে এর ছেলে একজন বিচক্ষণ এবং প্রতিভাবান ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিল। তার এবং তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। যদিও সে অধিকাংশ সময় অসুস্থ ছিল। তার সাথে তেমন কেউ মিশতো না। যার ফলে, বন্ধুত্ব বজায় রাখতে তাকে বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছে। এছাড়াও তাকে একটি নির্ধারিত খাবার তালিকা অনুসরণ করতে হতো। তার জন্য স্কুলে যাওয়াটাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
যখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে শুরু করলো, তখন তিনি বেশ আনন্দিত ছিল। এবং চিন্তা করেছিল, এটি তার জন্য উপকারী হয়েছে। কিন্তু একদিন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিল।
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এবং খাবারের প্রতি অবহেলা, আর সর্বোপরি সন্তানকে তার ঘরে তালাবদ্ধ দেখে বাবার হৃদয় ভেঙে যায়।
যদিও পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে মিশতে না পারায় বাবা বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করে। এছাড়া সন্তানের একটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হাতছাড়াও তাকে হতাশা করছে। তবে তিনি সন্তানের সাথে সত্যিকারের কী ভুল করেছে তা নিয়ে কথা বলতে নারাজ।
এমন মনোভাবের কারণ
জিন ইয়ং-হে এর স্ত্রী যখন ‘হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরি’তে আসেন, তখন তিনি অন্যান্য বিচ্ছিন্ন তরুণদের লেখা নোট পড়েন।
তিনি বলেন, ‘এই নোটগুলো পড়ে আমি বুঝতে পারলাম তাদের এই বিচ্ছিন্নতার কারণ। তারা মূলত, নীরবতার সাথে নিজেদের রক্ষা করছেন কারণ কেউ তাদেরকে বোঝে না।’
এছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে যে বিভিন্ন কারণ তরুণদের নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে দেয়।
মন্ত্রণালয়ের ১৯ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের জরিপ অনুসারে, সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হল:
চাকরি খুঁজে পেতে অসুবিধা (২৪.১%)
আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা (২৩.৫%)
পারিবারিক সমস্যা (১২.৪%)
স্বাস্থ্য সমস্যা (১২.৪%)
দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার হার রয়েছে এবং গত বছর দেশটির সরকার এটি মোকাবেলা করার লক্ষ্যে একটি পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
এছাড়াও মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা করা হয়, প্রতি দুই বছরে ২০-৩৪ বছর বয়সী লোকেদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে।







