রাশিয়ার সেনাবাহিনী সাথে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া ওয়াগনার গ্রুপের ভাড়াটে সৈন্যদের বিদ্রোহের পর দেশটির রাজধানী মস্কোতে জারি করা হয় জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা এখনও বহাল রয়েছে। এই ঘটনায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অবস্থান অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
বিবিসি জানিয়েছে, ওয়াগনার বাহিনীর বিদ্রোহের ফলে রাশিয়ায় সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে চুক্তি করেছে ক্রেমলিন এবং ওয়াগনার বাহিনী। কিন্তু রাশিয়া ইস্যুতে অনেক প্রশ্নই এখনও অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে।
পুতিন এরপর কী করবেন?
ওয়াগনার বিদ্রোহের ২৪ ঘণ্টায় ভ্লাদিমির পুতিনকে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনটা তার ক্ষমতা গ্রহণের দুই দশকের মধ্যে কখনো হয়নি। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পুতিনকে খুব শক্তিশালী ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না। বরং তাকে বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে।
গত শনিবার সকালে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে পুতিন যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে ওয়াগনার গ্রুপের বিরুদ্ধে তার ঘৃণা এবং বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। ওই ভাষণে তিনি ওয়াগনার নেতা ইয়েভগেনি প্রিগোশিনের বিরুদ্ধে ‘পিছন থেকে ছুরি মারা’ এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনেন।
এই ঘটনার পর থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি এমনকি তার কোনোও নতুন ভাষণের পরিকল্পনা করা হয়নি। গতকাল রোববার রাষ্ট্রীয় টিভিতে বিদ্রোহের আগে রেকর্ড করা একটি সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেছিলেন, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের অগ্রগতির বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী।
রাশিয়ার রাজধানীতে সন্ত্রাসবিরোধী নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট পুতিন এই মুহূর্তে রাশিয়ার রাজধানীতে আছেন কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ ধারণা করছেন পুতিন কোনোওনা কোনোওভাবে আক্রমণ করবেন সেটা হতে পারে ইউক্রেনে সেনা হামলা অথবা রাশিয়ার অভ্যন্তরে বিরোধীদের ওপর হামলা।
পোলিশ এমপি রাদেক সিকোরস্কি মনে করেন, এই ঘটনার পর পুতিনের শাসন একই সাথে আরও কর্তৃত্ববাদী এবং আরও নৃশংস’ হয়ে উঠতে পারেন।
বেলারুশে ওয়াগনার প্রধান প্রিগোশিন কী করতে যাচ্ছেন?
বিদ্রোহের পেছনের প্রধান ব্যক্তি ওয়াগনার বাহিনীর প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন, একজন স্বাধীন মানুষ। তিনি রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বকে উৎখাতের চেষ্টা করলেও তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের অভিযোগ তুলে নেয়া হয়েছে। তবে ক্রেমলিন এবং ওয়াগনারের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল তার পুরো বিবরণ জানা যায়নি।
প্রিগোশিন রাতের আধারেই মিলিয়ে যাবেন, রুশ বিশ্লেষকরা তা আশা করেন না। এই ভাড়াটে গ্রুপের নেতা দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করছেন। অথচ তিনি ইউক্রেনের হাজার হাজার যোদ্ধা জন্য এমনকি প্রেসিডেন্ট পুতিনের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
তিনি ক্রেমলিনের জন্য বছরের পর বছর বিতর্কিত কাজ করেছেন। বিশেষ করে সিরিয়ায় যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০১৪ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ পর্যন্ত। কিন্তু পুতিনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার পর কারো কারো মতে রুশ প্রেসিডেন্টকে অপমান করার পর প্রশ্ন উঠেছে প্রিগোশিনের নিরাপত্তার কী গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে?
এ বিদ্রোহ কিভাবে ইউক্রেনে যুদ্ধ প্রভাবিত করবে?
ওয়াগনার গ্রুপ ইউক্রেনের যুদ্ধে সবচেয়ে সফল সৈন্য দল পাঠিয়েছে, যদিও এর অনেক যোদ্ধাকে কারাগার থেকে আনা হয়েছে, স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফ্রন্টলাইন সার্ভিসের হয়ে লড়াই করতে প্রলুব্ধ করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, বাখমুত শহর রাশিয়ার দখলে আনতে এই ওয়াগনার সৈন্যদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা ছিল। রাশিয়া দাবি করেছে যে, ওয়াগনার বাহিনীর বিদ্রোহ এখন পর্যন্ত ইউক্রেন অভিযানে কোন প্রভাব ফেলেনি। তবে, যা ঘটছে রুশ বাহিনী নিঃসন্দেহে সে ব্যাপারে জানতে পেরেছে এবং এ খবরে তারা হতাশ হতে পারে।
শনিবারের ঘটনার পর আগামী দিনগুলোয় কী ধরণের প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেউ কেউ বলছেন যে, রাশিয়ায় সামনের দিনগুলোয় প্রতিদ্বন্দ্বী ইউনিটগুলির মধ্যে লড়াই শুরু হতে পারে। ইউক্রেনে, রাশিয়া তার সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারে এমন উদ্বেগের মধ্যে সামরিক নেতারা সীমান্তের অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যরা কি আগে থেকে জানত?
প্রিগোশিনের বিদ্রোহের বিষয়ে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থাগুলো আগে থেকেই ইঙ্গিত পেয়েছিল। এই সপ্তাহের শুরুতে কংগ্রেসের প্রধান নেতাদের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিষয়টি জানানো হয়, মার্কিন মিডিয়ার প্রতিবেদন তাই বলছে। সিএনএন জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দারা দেখেছে যে, ভাড়াটে গোষ্ঠীর নেতা রাশিয়ার সীমান্তের কাছে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করছেন।
এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধানরা কয়েক মাস ধরে প্রিগোশিন এবং রাশিয়ান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ সম্পর্কের উপর নজর রাখছিলেন এবং গোয়েন্দারা মনে করেন যে ইউক্রেনের যুদ্ধ ওয়াগনার এবং রুশ সামরিক বাহিনী উভয়ের জন্যই খারাপ হয়েছে।
রাশিয়ার মানুষ কী মনে করে?
সঙ্কট ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে পুতিন জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন সেখানে দেখা যায় যে তিনি এই হুমকিকে কতটা গুরুত্বের সাথে দেখছেন।
টেলিগ্রামে একজন শীর্ষস্থানীয় রাশিয়া বিশ্লেষক তাতিয়ানা স্ট্যানোভায়া লিখেছেন, “এলিট বাহিনীর মধ্যে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে পুতিনকে দোষারোপ করবে যে সবকিছু এতদূর গড়াল অথচ প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে যথাযথ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কিন্তু এই পুরো ঘটনাটি পুতিনের অবস্থানের জন্যও একটি আঘাত।”
যদিও সামগ্রিক রুশ জনমত সম্পর্কে এক কথায় কিছু বলা কঠিন। কেননা রোস্তভ শহরে ওয়াগনার ইউনিট চলে যাওয়ার সময় বেসামরিক মানুষ তাদের যেভাবে সাধুবাদ জানিয়েছে তা নিয়ে নেতারা উদ্বিগ্ন। তবে একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে কিছু বাসিন্দা ওয়াগনার আসার পর শনিবার ট্রেনে করে শহর ছেড়ে চলে যায়।







