আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতার নেপথ্যে কী, কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে ইউরোপজুড়ে?

ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতার নেপথ্যে কী, কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে ইউরোপজুড়ে?

ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমেই সহিংস রূপ নিয়েছে। শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে ব্যাপক সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় শত শত বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইউরোপের অন্য দেশেও একই ধরনের অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সপ্তাহান্তের সহিংসতার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। প্রেসিডেন্টের দপ্তর এলিসি প্রাসাদ জানিয়েছে, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নুনেজকে দায়িত্বে থাকতে বলেছেন মাখোঁ। একই সঙ্গে লুটপাট মোকাবিলায় নতুন কৌশল গ্রহণের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

শনিবার প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ। মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঙ্গের শহরেও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। রোববার প্যারিস ও মার্সেইয়ে আবারও সংঘর্ষ বাধে। এ সময় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের চেষ্টা ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করে দাঙ্গা পুলিশ।

রোববার বিকেলে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন মাখোঁ। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে এ পরিস্থিতি মাখোঁর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

যেভাবে শুরু বিক্ষোভ

গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ক্রেতেই শহরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। গ্রীষ্মের ছুটির পর বিদ্যালয়ে ফিরে শিক্ষক ও কর্মীর ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে ক্লাস বর্জন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবরোধ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে প্যারিসের আশপাশের এলাকায়। একপর্যায়ে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি ছোট শহরগুলোতেও পৌঁছে যায়।

অবকাঠামোগত দুরবস্থা, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও কর্মীর অভাব এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের এলাকায় বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফরাসি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে জরাজীর্ণ ভবন, ছাদ ধসে পড়া, পানি চুইয়ে পড়া, ভাঙা আসবাব এবং বিদ্যালয়ে ইঁদুরের উপদ্রবের চিত্র উঠে আসে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার শীতকালে পর্যাপ্ত উষ্ণতার অভাবেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ ক্লাসের চাপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জটিল ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। বিক্ষোভে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীও।

ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না—এমন উদ্বেগও রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচি পিসার সর্বশেষ প্রতিবেদনে পড়ার দক্ষতা ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফলাফল কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষোভ

শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবিকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হলেও শনিবার এতে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক কল্যাণব্যবস্থার অবনতির অভিযোগ বিক্ষোভকে আরও বিস্তৃত করে।

ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানায়। সংগঠনটি দ্রব্যমূল্য কমানো এবং পেনশন ও মজুরি বাড়ানোর দাবি তোলে।

শনিবার দেশজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। মার্সেইয়ে বিক্ষোভকারীরা সিটি হল প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েন এবং একটি দেয়ালে নৈরাজ্যবাদের প্রতীক ‘এ’ আঁকেন। প্যারিসে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে।

লিওঁ শহরে বিক্ষোভকারীরা শহরের পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। ফরাসি কর্তৃপক্ষের দাবি, সারা দেশে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শুধু প্যারিসেই ৮০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। দেশজুড়ে নজিরবিহীন সহিংসতার ঘটনায় ক্ষোভ ও লজ্জা প্রকাশ করে তিনি বলেন, যারা সহিংসতা উসকে দিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, তাদের কাছে সরকার নতি স্বীকার করবে না। প্রয়োজনে দাঙ্গা ও ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দমনে দাঙ্গা পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ব্যবহার নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রের কারণে কিশোরদের গুরুতর আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

একটি ঘটনায় পুলিশের নিক্ষেপ করা কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেডের আঘাতে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের চোয়াল ভেঙে যায় এবং দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্য একটি ঘটনায় পুলিশের স্টান গ্রেনেডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিস্ফোরণে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের অস্ত্রের আঘাতে আরও কয়েকজন কিশোর স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশ ও বিদ্যালয়ের কর্মীদের ওপর শক্তিশালী আতশবাজি এবং আঘাতের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে অ্যাসিডও ছোড়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একদল ব্যক্তি ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িয়ে পড়েছে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাখোঁর উত্তরসূরি হওয়ার প্রত্যাশায় থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ঘটনাটিকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছেন। সংবিধান অনুযায়ী, মাখোঁ টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।

বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তার দল একটি সমাবেশে উচ্চবিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানায়। পাশাপাশি ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনী ভর্তি ব্যবস্থা বাতিলের প্রস্তাবও দেয় দলটি।

অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন ল্য পেন দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট পদে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন, রক্ষণশীল সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের নিন্দা করেছেন।

ইউরোপের অন্য দেশেও অস্থিরতার ইঙ্গিত

ফ্রান্সে রাজপথে আন্দোলন নতুন ঘটনা নয়। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে ১৯৬৮ সালের ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন, ২০০৫ সালের শহরতলির সহিংসতা, ২০১৮-১৯ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এবং ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর প্রতিবাদ—বিভিন্ন সময়ে দেশটিতে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের খবর।

প্রতিবেশী বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরে সহিংসতা ও গ্রেপ্তারের ঘটনার পর কয়েকটি বিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়। ইতালির কয়েকটি শহরেও গত সপ্তাহে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। ফ্রান্সের তুলনায় এসব বিক্ষোভের ব্যাপ্তি কম হলেও সেখানে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

শনিবার মিলানে যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে একটি মিছিল শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। পরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, দোকানপাটে লুটপাট চালায় এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেয়। সাধারণত ক্রেতা ও পর্যটকদের ভিড়ে মুখর থাকা পিয়াজা দেল দুয়োমো ও একটি বিলাসপণ্যের বিপণিবিতান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিক্ষোভকারীরা পাথর, রাস্তার পেভমেন্টের ব্লক ও অন্যান্য বস্তু দাঙ্গা পুলিশের দিকে ছুড়ে মারেন। তারা বার টেবিল দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধকতায় আগুন ধরিয়ে দেন। সংঘর্ষের পর প্রকাশিত ছবিতে ইতালির সামরিক পুলিশ বাহিনী কারাবিনিয়েরির একটি গাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। সংবাদ সংস্থা লা প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত দুই পুলিশ সদস্য আহত হন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কসহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল শিক্ষার্থীদের অসন্তোষে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বেলজিয়াম ও ইতালিতে সংঘর্ষের ঘটনা ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। তবে এসব বিক্ষোভ একই আন্দোলনের অংশ কি না, কিংবা তা ইউরোপজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পরিস্থিতির গতিপথ নির্ভর করবে সরকারের পদক্ষেপ, বিক্ষোভকারীদের দাবি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিক্রিয়ার ওপর।

 

বিষয়:ইমানুয়েল মাখোঁ এলিসি প্রাসাদ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ফ্রান্সে বিক্ষোভ ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…