‘‘আগামীকাল, আগামী সপ্তাহ, আগামী মাস এবং আগামী বছর কি হতে যাচ্ছে তা বলতে পারার সক্ষমতাই হচ্ছে রাজনীতি। এবং পরবর্তীতে সেটা কেন হলো না, তা ব্যাখ্যা করতে পারার যোগ্যতাও রাজনীতির অংশ।’’ সাবেক বিট্রিশ প্রধানমন্ত্রী ও লেখক উইনস্টন চার্চিলের এই বক্তব্য যেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সঠিক বলে প্রমাণিত হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে।
এমনটা কেন মনে করা হচ্ছে সেই ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে চিন্তা করা যেতে পারে।
জনরোষের মুখে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালানোর পর ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ইতোমধ্যে এ সরকার তাদের কার্যক্রমের ‘দ্বিতীয় অধ্যায়’ শুরু করেছে বলে উল্লেখ করেছেন ড. ইউনূস। এই অধ্যায়ে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সংবিধান, নির্বাচন, জনপ্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যের জায়গাগুলো বের করতে চাইছেন।
তবে বিধিবাম। কারণ জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পুলিশসহ বাহিনীগুলো পুরোপুরি সক্রিয় হতে না পারার কারণে এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খানিকটা অবনতি হয়েছে। যদিও যতটা অবনতি হয়েছে, তার চেয়ে গণমাধ্যমে ফলাও করে একই ধরনের প্রতিবেদন প্রচার হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে সরকার সংশ্লিষ্টদের কাছে। কিন্তু চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই রোধে তৈরি হচ্ছে জনমত। খোদ বিভিন্ন এলাকার মানুষই রাত জেগে এসব অপরাধ ঠেকাতে পাহারা-টহল শুরু করেছে। ফলে এসব ইস্যুতে নতুন করে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা বা মব তৈরির আশঙ্কা জাগছে। অবশ্য, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপও দৃশ্যমান হচ্ছে নাগরিকদের কাছে।
এদিকে নিজেরা কাদা–ছোড়াছুড়ি, মারামারি ও কাটাকাটি করলে দেশ ও জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে বলে সতর্ক করেছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এই দেশ আমাদের সবার উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবাই সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা চাই না হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মতের বিরোধ থাকতে পারে, চিন্তাচেতনার বিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু দিন শেষে দেশ ও জাতির দিকে খেয়াল করে আমরা সবাই যেন এক থাকতে পারি। তাহলেই এই দেশটা উন্নত হবে, এই দেশটা সঠিক পথে পরিচালিত হবে। না হলে আমরা আরও সমস্যার মধ্যে পড়তে যাব। বিশ্বাস করেন, ডোন্ট ওয়ান্ট টু হেড, ওই দিকে আমরা যেতে চাই না।’
‘এখানে যেসব উচ্ছৃঙ্খল কাজ হয়েছে, সেটা আমাদের নিজস্ব তৈরি। এটা আমাদের নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারড, আমরা নিজেরা এইগুলো তৈরি করেছি। এই বিপরীতমুখী কাজ করলে দেশে কখনো শান্তিশৃঙ্খলা আসবে না, এই জিনিসটা আপনাদের মনে রাখতে হবে।’
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ষষ্ঠদশ বার্ষিকীতে গত মঙ্গলবার দেশে বিরাজমান পরিস্থিতির বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর সেনাপ্রধানকে কখনো এমন কড়া ভাষায় বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি আগে। এজন্য তার ঐ বক্তব্যকে সবদিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন রাজনীতি এবং সমাজ সচেতন ব্যক্তিত্বরা।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরের সদর দপ্তরে বাহিনীটির কিছু বিপথগামী সদস্যের বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারানোর বিষয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, এই বর্বরতা কোনো সেনাসদস্য করেনি। সম্পূর্ণটাই তদানীন্তন বিডিআর সদস্য দ্বারা সংঘটিত। ফুলস্টপ। এখানে কোনো ইফ এবং বাট (যদি ও কিন্তু) নাই। এখানে যদি ইফ এবং বাট আনেন, এই যে বিচারিক কার্যক্রম এতদিন ধরে হয়েছে, ১৬ বছর ধরে, ১৭ বছর ধরে যারা জেলে আছে, যারা কনভিকটেড, সেই বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। এই জিনিসটা আমাদের খুব পরিষ্কার করে মনে রাখা প্রয়োজন। এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করবেন না। যে সমস্ত সদস্য শাস্তি পেয়েছে, তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। ’
এদিকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের মাৎস্যন্যায় শুরু হয়ে গেছে কিনা এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা। তবে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে এই বিষয়ে বিজয় সরণি এলাকায় সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা ব্রিফিংয়ে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, দেশের ক্রান্তিলগ্নে জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য যদি কেউ চেষ্টা করে, সেটা রাজনৈতিক হোক বা নিতান্তই ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা হোক, তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। বড় ধরনের অপরাধ কমলেও ছোটখাটো অপরাধ, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা সরকার অ্যাড্রেস করছে। আশা করা যায়, খুব দ্রুতই সুফল পাওয়া যাবে। ঘটনাগুলো যথাসম্ভব কমে আসবে।
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম স্লোগান ছিল ‘‘ক্ষমতা না জনতা?’’ সবাই সমস্বরে উত্তর দিয়েছিল ‘‘জনতা, জনতা।’’
জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস এবং প্লেটো সঙ্গত কারণে গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং অপছন্দ করে থাকলেও বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা হলো গণতন্ত্র। বিশ্বের ৮৬ শতাংশ মানুষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করতে চান এবং দুই-তৃতীয়াংশ (৬২ শতাংশ) মানুষ অন্য যেকোনো শাসনব্যবস্থার চেয়ে এটিকে বেশি পছন্দ করেন।’
তাই দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আশাবাদ জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার–উজ–জামান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা দেশে একটা ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশনের জন্য (সামনের) দিকে ধাবিত হচ্ছি। তার আগে যেসব সংস্কার করা প্রয়োজন, অবশ্যই সরকার এদিকে হেল্প করবে।’
এ প্রসঙ্গে সেনাপ্রধান আরও বলেন, ‘আমি যতবারই ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি হি কমপ্লিটলি অ্যাগ্রিজ উইথ মি, দেয়ার শুড বি ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অ্যান্ড দ্যাট ইলেকশন শুড বি উইদিন ডিসেম্বর অর… (আমি যতবারই ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি তিনি সম্পূর্ণভাবে আমার সঙ্গে একমত হয়েছেন যে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হওয়া উচিত এবং সেই নির্বাচন হওয়া উচিত ডিসেম্বরের মধ্যে বা…)। যেটা আমি প্রথমেই বলেছিলাম যে ১৮ মাসের মধ্যে একটা ইলেকশন। আমার মনে হয়, সরকার সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ড. ইউনূস যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন, যে দেশটাকে ইউনাইটেড রাখতে। কাজ করে যাচ্ছেন উনি, তাঁকে আমাদের সাহায্য করতে হবে, উনি যেন সফল হতে পারেন। সেদিকে আমরা সবাই চেষ্টা করব। আমরা একসাথে ইনশা আল্লাহ কাজ করে যাব।’
সম্প্রতি আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন।
এছাড়া নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ নিয়েও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি স্টেফান। তিনি বলেন, গত ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছিল কমিশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ কমিশনকে কী ধরনের কারিগরি সহায়তা দিতে পারে সেটা জানানোর জন্য জানুয়ারিতে একটি দল দুই সপ্তাহ ধরে নির্বাচন কমিশন পরিদর্শন করেছে।
সবশেষে বলা যায় বিপ্লব সফল হলো। তবে স্বীকার করতেই হবে যে, বিপ্লব-পরবর্তী এর একটা সহিংস রূপ আছে। এই পরিবর্তনের ধাক্কায় অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ইতিহাসে যখনই কোনো বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তখনই তা সমাজের ভেতরে একটি গভীর পরিবর্তন এনেছে। এটি যেমন ফরাসি বিপ্লবের পরে ঘটেছিল, তেমনি আমেরিকান বিপ্লব, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এবং সাম্প্রতিক আরব বসন্তের পরও তা দেখা গেছে।
তাই আমাদের সকলের উচিত এই ক্রান্তিকালে ধৈর্য্য ধারণ করে নিজ নিজ জায়গা থেকে দেশ এবং মানুষের স্বার্থে কাজ করা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







