স্মাইলিং ডিপ্রেশন: হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতা চিনবেন কীভাবে?

ছবি: সংগৃহীত
বিষণ্ণতায় ভোগা কোনো মানুষের কথা ভাবলে আপনি হয়ত এমন কোনো মানুষের কথা ভাবেন, যিনি বিছানা থেকে উঠতে রীতিমতো যুদ্ধ করছেন।
হয়তো তারা খুব কাঁদেন, বন্ধুদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন, অথবা দিন পার করার মতো শক্তিও তাদের শরীরে বা মনে থাকে না।
কিন্তু আপনি সম্ভবত এমন কারো কথা ভাবেন না, যিনি রাতের খাবারের টেবিলে রসিকতা করছেন, ব্যস্ত সামাজিক জীবন সামলাচ্ছেন এবং কর্মক্ষেত্রে সফল।
কিন্তু তথাকথিত ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বা ‘হাসির বিষণ্ণতা’য় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, ব্যাপারটা ঠিক এমনই হতে পারে।
আর কখনও কখনও সেই মানুষটি কোনো বন্ধু, সঙ্গী বা সহকর্মী নন- বরং, হতে পারেন স্বয়ং আপনি-ই।
‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বলতে কী বোঝায়?
‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত কোনো রোগ নয়, কিন্তু গত পাঁচ বছরে এ শব্দ বা পরিভাষাটির অনুসন্ধান ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক ডক্টর অলিভিয়া রেমিস বলেন, “এর অর্থ হলো বাইরে থেকে খুশি দেখালেও, ভেতরে ভেতরে আপনি বিষণ্ণ ও হতাশ বোধ করছেন।”
আমরা সবাই মাঝে মাঝে মনমরা বোধ করি। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে ৩২ কোটির বেশি মানুষের ক্ষেত্রে এ অনুভূতিগুলো বিষণ্ণতায় পরিণত হয়।
এটি এমন একটি অবস্থা যখন দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা অথবা কোনো বিষয়ে আগ্রহ ও আনন্দ হারিয়ে ফেলার মতো লক্ষণগুলো সপ্তাহ বা মাস ধরে চলতে থাকে এবং তা কাজ, সম্পর্ক, ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে।
কিন্তু বিষণ্ণতার লক্ষণ সবসময় আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না।
প্রকৃতপক্ষে, গবেষণায় দেখা গেছে যে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এর একটি ‘অস্বাভাবিক’ রূপ অনুভব করেন, যেখানে লক্ষণগুলো গতানুগতিক ধারণার থেকে ভিন্ন হয়।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ স্বাভাবিকের চেয়ে কম ঘুমানোর বা খাওয়ার পরিবর্তে বেশি ঘুমাতে বা খেতে পারে, আবার ভালো বা উত্তেজনাপূর্ণ কিছু ঘটলে তার মেজাজ সাময়িকভাবে ভালো হয়ে যেতে পারে।
এবং এমন প্রমাণ রয়েছে যে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের ভেতরের অবস্থা আড়াল করার জন্য কৌশলের ব্যবহার করতে পারেন, যা ‘মাস্কিং’ নামেও পরিচিত।
এর মানে হলো – যখন কোনো মানুষ অন্যদের সাথে মিশে যাওয়ার জন্য তার কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা আবেগ লুকানোর চেষ্টা করে।
মানুষ কেন বিষণ্ণতা গোপন করে?
‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’-এ আক্রান্ত কিছু মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তারা বিষণ্ণ, তাই তারা যে এই বিষয়টি গোপন করছেন, তাও জানেন না বা বুঝতে পারেন না।
“তারা হয়তো মনে করেন যে তাদের উপসর্গগুলো কেবল ব্যস্ত ও চাপপূর্ণ জীবনযাপনেরই একটি অংশ,” রেমিস বলেন।
অন্যরা হয়তো বুঝতে পারে যে তারা সমস্যায় আছে, কিন্তু অন্য কেউ যাতে তা খেয়াল না করে, সে জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে- যা বিশেষ করে পারফেকশনিস্ট এবং অতি কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
“তাদের নিজেদের কাছে প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে এবং তারা হয়তো নিজেদের কাছে বা অন্য কারো কাছে স্বীকার করতে চায় না যে তারা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে,” তিনি বলেন।
কিছু মানুষ সামাজিক কলঙ্ক এবং অন্যদের উপর বোঝা চাপানোর ভয় পান।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, অন্যরা হয়তো সমালোচিত হওয়ার বা কর্মক্ষেত্রে কিংবা সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পরিণতির সম্মুখীন হওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন।
সাংস্কৃতিক বা পারিবারিক প্রত্যাশার কারণেও মন খুলে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বিষণ্ণতা গোপন করার ঝুঁকিগুলো কী কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাহ্যিক রূপ বজায় রাখা বিপজ্জনক হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক বার্নি ডান বলেন, “বিষণ্ণতা আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং নিঃসঙ্গ বোধ করায়, আর মন খারাপের অন্যতম সেরা প্রতিষেধক হলো প্রায়শই অন্যদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা।”
এর মানে এও হতে পারে যে, মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য পায় না।
রেমিস বলেন, “এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো যদি আমলে না নেওয়া হয়, তবে তা বাড়তে বাড়তে দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর কিছুতে পরিণত হতে পারে এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।”
বিষণ্ণতার সাতটি লক্ষণ যা সহজে চোখে পড়ে না
যখন মনে হয় আপনি ভালোভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন, তখন কিছু পরিবর্তন সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।
১. কোনো কিছু উপভোগ করা বন্ধ করে দিয়েছেন
যেসব কাজের জন্য আপনি সাধারণত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন—যেমন বন্ধুদের সাথে দেখা করা, জিমে যাওয়া বা এমনকি আপনার প্রিয় টিভি শো দেখা- সেগুলো যদি এখন একঘেয়ে বা ঝামেলার মতো মনে হতে শুরু করে, তবে বিষয়টি নিয়ে আরেকটু গভীরভাবে ভাবা যেতে পারে।
“ব্যস্ততা এবং দ্রুতগতির জীবনের কারণে সাধারণ শখগুলোতে আনন্দ বা আগ্রহের অভাবকে দায়ী করা সহজ,” রেমিস বলেন।
২. আপনার হাত বা পা অস্বাভাবিক ভারী লাগছে
‘লেডেন প্যারালাইসিস’ নামে পরিচিত, হাত-পায়ে এই ভারাক্রান্ত অনুভূতি, যা দৈনন্দিন চলাফেরাকে আরও কষ্টসাধ্য করে তোলে, তা অ্যাটিপিক্যাল ডিপ্রেশনের একটি লক্ষণ হতে পারে।
৩. আপনি বারবার পরিকল্পনা বাতিল করেন
অন্যদের সাথে থাকলে আপনাকে মাঝে মাঝে বেশ প্রাণবন্ত মনে হলেও, মন খারাপ হলে এবং নিজের অনুভূতি আর লুকাতে না পারলে আপনি পরিকল্পনা বাতিল করে দেন।
৪. আপনি বেশি ঘুমাচ্ছেন – কিন্তু তারপরেও ক্লান্ত বোধ করছেন
আপনি হয়তো আপনার সব স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তারপরেও ক্রমশ ক্লান্ত বোধ করছেন।
রেমিস বলেন, “সন্ধ্যাগুলো বিশেষভাবে কঠিন হতে পারে, কারণ এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দিনের শেষে আরও বেশি অসুস্থ বোধ করতে পারেন এবং তাদের স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে।”
৫. আপনি সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যানের প্রতি বেশি সংবেদনশীল
আপনার বসের করা একটি মামুলি মন্তব্য বা বন্ধুর পরিকল্পনা বাতিল করে দেওয়াটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট দিতে পারে।
রেমিস বলেন, সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যানের প্রতি বর্ধিত সংবেদনশীলতা- যা এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তিরাও অনুভব করতে পারেন- অস্বাভাবিক বিষণ্ণতার একটি বৈশিষ্ট্য।
৬. সবসময় মজার মানুষ বা ভালো সাহায্যকারী
বিষণ্ণতায় ভুগছেন এমন কেউ সবসময় নিজেকে গুটিয়ে নেন না এবং প্রায়শই এর বিপরীত কাজ করতে পারেন, যেমন—কোনো আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠা, কাজে পুরোপুরি ডুবে যাওয়া অথবা অন্যকে সাহায্য করার জন্য নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করা।
৭. মনের ভেতরে ক্রমাগত নেতিবাচক কথা
বাইরে থেকে আপনাকে আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে আপনি নিজের প্রতি অনেক বেশি সমালোচনামূলক হতে পারেন।
আত্মসন্দেহ, নিজেকে মূল্যহীন মনে করা এবং শূন্যতার চিন্তা সম্ভাব্য সতর্ক সংকেত।
কী সাহায্য করতে পারে?
‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ পরিভাষাটিরও সমালোচক রয়েছে।
রেইমস বলেন, যদিও এটি মানুষকে তাদের অভিজ্ঞতাকে চিনতে ও তার নাম দিতে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি একটি জটিল অভিজ্ঞতাকে “অতিরিক্ত সরলীকরণ”ও করতে পারে।
তিনি বলেন, “’হাসি’ শব্দটি শুনলে আনন্দ ও সুখের কথা মনে আসে, কিন্তু এই অবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য হলো আসলে হতাশা, শূন্যতা এবং মূল্যহীনতা।”
ডান পরামর্শ দেন, আপনার বিশ্বস্ত কারো সঙ্গে নিজের অনুভূতির কিছুটা ভাগ করে নিয়ে ছোট করে শুরু করতে।
তিনি বলেন, “প্রায়শই ব্যক্তিরা এটা দেখে অবাক হন যে, এটি অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে পারে, তাদের সংযুক্ত বোধ করতে সাহায্য করতে পারে এবং এই উপলব্ধি করতে পারে যে, এইরকম অনুভূতি হওয়ার ক্ষেত্রে তারা একা নন।”
আর যদি আপনি সমস্যায় পড়েন, তবে তিনি আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, “এমন জোরালো প্রমাণ রয়েছে যে কথা বলা, (বিষণ্ণতারোধী) ওষুধ এবং সামাজিক চিকিৎসা- সবই কার্যকর হতে পারে।”


