পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বড় জয়ের পর কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটতে পারে বলে মনে করছেন দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, সিএএ-এনআরসি বাস্তবায়ন এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে দ্রুত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
বুধবার (৬ মে) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানায়, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম বড় মতবিরোধ ছিল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট জমি অধিগ্রহণ ইস্যুতে। ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তের বড় একটি অংশ এখনও বেড়াবিহীন, যা অনুপ্রবেশ, গবাদি পশু পাচার এবং জাল নোট চক্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ভারতের অভিযোগ।
সূত্রের দাবি, রাজ্য সরকারের জমি অধিগ্রহণে অনীহার কারণে বহু বছর ধরে বেড়া নির্মাণের কাজ থমকে ছিল। তবে বিজেপি সরকার গঠিত হলে এই প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা হবে।
২০২১ সালে কেন্দ্রীয় সরকার সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর কার্যপরিধি ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই সিদ্ধান্তকে রাজ্যের পুলিশি ক্ষমতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে আখ্যা দেয় এবং বিধানসভায় এর বিরুদ্ধে প্রস্তাবও পাস করে। ফলে বিএসএফ ও রাজ্য পুলিশের মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি তৈরি হয়, যা সীমান্ত নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়ন নিয়েও কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ ছিল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, বাংলায় এই দুটি আইন কার্যকর করতে দেওয়া হবে না। এর ফলে প্রশাসনিক তথ্য আদান-প্রদান ও প্রক্রিয়া শুরুতে বিলম্ব ঘটে, যা অনুপ্রবেশকারী শনাক্তকরণে বাধা সৃষ্টি করে বলে কেন্দ্রের অভিযোগ।
সূত্রের অভিযোগ, জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে রাজ্যের সমন্বয়ও যথাযথ ছিল না। খাগড়াগড় বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন ঘটনায় তদন্তে সহযোগিতার অভাবের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ২০২২ সালের ভূপতিনগর বিস্ফোরণের তদন্তে কেন্দ্রীয় দল হামলার মুখেও পড়েছিল বলে দাবি করা হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়েও কেন্দ্র-রাজ্য টানাপোড়েন ছিল।
২০২১ সালের বিধানসভা, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়ে রাজ্য সরকার আদালতের দ্বারস্থ হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয় এবং কিছু এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ে বলে অভিযোগ।
বিজেপি সরকার গঠনের পর সীমান্ত বেড়া নির্মাণে গতি আসবে এবং জমি অধিগ্রহণ দ্রুত সম্পন্ন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্ত বেড়ার জন্য জমি বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া অনুপ্রবেশ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে বিএসএফ ও রাজ্য পুলিশের যৌথ অভিযান জোরদার করা হবে। একইসঙ্গে ‘শনাক্ত, নির্মূল ও বিতাড়ন’ নীতির মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকেও আরও স্বাধীনতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সূত্র। সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ও স্লিপার সেল দমনে এনআইএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সহায়তা বাড়ানো হবে, যা সামগ্রিকভাবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে।







