মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে আমাদের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় হিসেবে পরিচিত নিয়ানডার্থালরা (Neanderthals)। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই আদিম মানুষগুলো আধুনিক মানুষের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং পেশিবহুল ছিল। তবে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক জেনেটিক ও অ্যানাটমিক্যাল গবেষণা এই ধারণায় কিছুটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
ফসিল বা জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিয়ানডার্থালদের হাড় আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক বেশি ঘন এবং মজবুত ছিল। তাদের চওড়া কাঁধ এবং ব্যারেল আকৃতির বুক প্রমাণ করে যে, তাদের শরীরে প্রচুর পেশি ধারণ করার সক্ষমতা ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, তাদের এই দৈহিক গঠন দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ের জন্য নয়, বরং কাছাকাছি থেকে বড় প্রাণীর সঙ্গে লড়াই বা শিকারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর গবেষণা নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইউরোপ ও জাপানের একদল গবেষক নিয়ানডার্থাল জেনোম বিশ্লেষণ করে AMPD1 নামক একটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ানডার্থালদের এই জিনটি আধুনিক মানুষের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম কার্যকর ছিল।
ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের বিবর্তনীয় জেনেটিক্সবিদ হুগো জেবার্গের মতে, এই জিনের অকার্যকারিতার কারণে নিয়ানডার্থালদের পেশি হয়তো দ্রুত শক্তি উৎপাদন করতে পারলেও দীর্ঘক্ষণ সেই শক্তি ধরে রাখতে পারত না। অর্থাৎ, তারা প্রচণ্ড শক্তিশালী হলেও বর্তমান যুগের দক্ষ অ্যাথলেটদের মতো স্ট্যামিনা বা সহনশীলতা তাদের ছিল না।
নিয়ানডার্থালরা মূলত ‘অ্যাম্বুশ হান্টার’ বা ওত পেতে শিকারি ছিল। আধুনিক মানুষ যেখানে বর্শা ছুড়ে বা দূর থেকে শিকার করত, নিয়ানডার্থালরা বড় প্রাণীকে বর্শা দিয়ে সরাসরি আঘাত করে শিকার করতে পছন্দ করত। তাদের হাতের আঙুল এবং কবজির গঠন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, যা ভারি কাজ করার জন্য উপযোগী।
নিয়ানডার্থালরা শারীরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও কেন টিকে থাকতে পারল না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক আছে। সাম্প্রতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, কেবল জলবায়ু পরিবর্তন নয়, বরং আধুনিক মানুষের উন্নত সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং উন্নত প্রযুক্তির কাছে তারা হেরে গিয়েছিল। এ ছাড়া, ছোট ও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে বাস করার কারণে তাদের মধ্যে রোগব্যাধি ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি ছিল এবং জিনগত বৈচিত্র্য কমে গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিয়ানডার্থালদের দেহ হিমযুগের চরম ঠান্ডায় টিকে থাকার জন্য অভিযোজিত হলেও, দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে তারা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। তবে মজার বিষয় হলো, আজও আধুনিক মানুষের ডিএনএ-তে ২ থেকে ৪ শতাংশ নিয়ানডার্থাল জিনের অস্তিত্ব রয়ে গেছে।
এই ভিডিওটিতে নিয়ানডার্থালদের জেনেটিক সীমাবদ্ধতা এবং তাদের পেশির শক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।








