মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে ঘিরে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল নিতে ভিড় বেড়েছে। বাড়তি চাহিদা ও আতঙ্কে তেল কেনার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পাম্পে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে এবং কোথাও কোথাও তেল না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে চালকদের। এতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যানজটও বেড়ে যাচ্ছে।
শনিবার ৭ মার্চ সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বিশেষ করে শাহবাগ, পরীবাগ, তেজগাঁও, নীলক্ষেত, আসাদগেট, কল্যাণপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে আশপাশের সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকার খালেক স্টেশন সার্ভিস পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকেরা। মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী কবির হোসেন জানান, গত রাতে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তিনি পেট্রোল পাননি। শনিবার সকালে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত দুই লিটার অকটেন পেলেও, সেই তেল কিনতেই তাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ ছোট পাম্প বন্ধ রয়েছে। বড় পাম্পগুলোতে প্রচণ্ড ভিড়, অনেক জায়গায় পাম্পের আশপাশে এক কিলোমিটারের বেশি লাইন তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন মোটরসাইকেল চালকেরা।
শনিবার আসাদগেটের তালুকদার পাম্প, সোনার বাংলা, কল্যাণপুরের খালেক পাম্প, টেকনিক্যাল ও মাজার রোডের ফিলিং স্টেশন, ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এবং তেজগাঁওয়ের কয়েকটি পাম্পসহ মোট ১১টি পাম্প ঘুরে দেখা যায়- অধিকাংশ পাম্প তেল নিতে আসা অনেক যানবাহনকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কোথাও কোথাও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।
তালুকদার পাম্পে লাইনে দাঁড়ানো রাশেদ খান নামে এক বাইকার বলেন, জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। ফুয়েল ক্রয়ের ওপর সীমা নির্ধারণ করায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যার ফলে অনেকেই বাড়তি তেল কিনতে চাইছেন এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।
শাহীন ইসলাম নামে এক প্রাইভেটকার চালক বলেন, তেলের লাইনে জায়গা না পেয়ে অনেকে গ্যাস নিতে যাচ্ছেন। এতে গ্যাস স্টেশনগুলোতেও চাপ বাড়ছে।
শ্যামলী সাহিল ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল ও গ্যাস- দুটোরই ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে তেল নিতে আসা যানবাহনগুলোকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্টেশনের কর্মচারী মেহেদি বলেন, গতকাল বিকেল পর্যন্ত তেল বিক্রি করা হয়েছে। এরপর তেল শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তেল না থাকলেও লাইন কমছে না।
খালেক স্টেশনের কর্মচারী সুমন বলেন, তেলের গাড়ি লোড করা হচ্ছে। কিন্তু যে পরিমাণ চাপ, তা সামাল দিতে আরও অনেক স্টেশন প্রয়োজন। সীমিত সংখ্যক পাম্পে তেল দেওয়ায় কয়েকটি জায়গায় দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।
ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক স্থানে যানজট ও বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও চালক ও পাম্পকর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
আসাদগেটে ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সড়কে যানজট নিরসনের পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও নজরদারি করতে হচ্ছে। পাম্প মালিক, শ্রমিক ও পুলিশের সমন্বয়ে যানবাহনের জন্য আলাদা লাইন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে প্রধান সড়কসংলগ্ন পাম্পগুলোতে যানজট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে পাম্প মালিকরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ডিপো থেকে তেল কম আসায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
অন্যদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, কিছু পাম্পে তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও বিক্রি বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা পাম্পগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আগামী রোববার (৮ মার্চ) থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু করা হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।







