গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দীর্ঘ ১৮ মাস পর আজ নতুন ভোরের অপেক্ষায় বাংলাদেশ। দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। তবে এবারের ভোট কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে ঐতিহাসিক ‘গণভোট’।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের আয়োজন প্রচলিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো নয়। একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য ভোট হলে এটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ হতে পারে। আর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, যা চলবে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসীর উদ্দিন সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর ভোটের প্রত্যাশা জানিয়েছেন।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। ‘একতরফা’, ‘রাতের ভোট’ ও ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হিসেবে পরিচিত ওই ভোটগুলোতে বড় অংশের ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে অভিযোগ ছিল। ফলে এবারের ভোটকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ লক্ষণীয়। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া প্রচারপর্ব ছিল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
ভোটের দিন সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সাড়ে ৯ লাখের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। রাজধানী থেকে দুই দিন ধরে অনেকে গ্রামের বাড়িতে গেছেন ভোট দিতে।
একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে। বাকি ২৯৯টি আসনে নিবন্ধিত ৬০ দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ নিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি অংশ নিতে পারছে না।
১৯৯১ সালের পর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে প্রতিযোগিতা জমেছে। স্বাধীনতার পর প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
এবার মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার ৫ কোটিরও বেশি। প্রায় অর্ধেক ভোটার নারী। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ও নারী ভোটারদের ভূমিকাই ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নির্বাচন ও সংস্কারের প্রেক্ষাপট
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। পরে ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। সমালোচকদের মতে, পরবর্তী সময়ে সরকার ক্রমে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে এবং বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পতন ঘটে। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এই তিন অঙ্গীকার সামনে রেখে কাজ শুরু করে সরকার।
ইতিমধ্যে জুলাই-আগস্টের সহিংসতার কিছু ঘটনার বিচার হয়েছে। একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে।
সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে ৮৪টি প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়, যার ৪৮টি সংবিধান-সংক্রান্ত। এসব প্রস্তাব নিয়েই আজকের গণভোট।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের ঝুঁকি রোধে ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।
‘হ্যাঁ’ জিতলে কী বদলাবে
গণভোটে প্রস্তাবগুলো পাস হলে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পাবে এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে। সাংবিধানিক পদে নিয়োগে বহুপক্ষীয় কমিটির ভূমিকা থাকবে। সংসদ সদস্যদের ভোটদানে স্বাধীনতাও বাড়বে। ফলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কিছু বিষয়ে বিএনপির আপত্তি ছিল।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে আগামী সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ সহজ নয়। তবে বহু ত্যাগের বিনিময়ে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগানো জরুরি।
আওয়ামী লীগ না থাকায় প্রশ্ন
নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই। তাদের জোটভুক্ত কয়েকটি দলসহ মোট নয়টি দল অংশ নিচ্ছে না। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী সামাজিক মাধ্যমে ভোট বর্জনের আহ্বান জানালেও নির্বাচন কমিশন বলছে, এতে ভোটার উপস্থিতি কমবে না।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ঘাটতির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে। যারা ভোটাধিকার খর্ব করেছে, তারা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি এ কারণে কিছু দল অংশ নিতে পারছে না।
ইসির প্রথম বড় পরীক্ষা
বর্তমান নির্বাচন কমিশন ২০২৪ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব নেয়। একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আচরণবিধি প্রয়োগ ও মনোনয়ন যাচাইয়ে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও সিইসি বলেছেন, অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে আইন অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই গণতান্ত্রিক উত্তরণের সূচনা। এখন পর্যন্ত পরিবেশ ইতিবাচক সব পক্ষ দায়িত্বশীল আচরণ করলে নতুন অধ্যায়ের সূচনা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আজকের ভোটই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে।







