প্রায় এক মাস আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা শেষ করতে একটি ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জোর দাবি করেছেন। তবে এই বয়ানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি বারবার অস্বীকার করে আসছেন।
যুদ্ধের ডামাডোল আর সব পক্ষের প্রচারণার ভিড়ে আসলে কে সত্য বলছে, তা বোঝা বেশ কঠিন। তবে কোনো সম্ভাব্য আলোচনা থেকে কিংবা সংঘাতের অবসান ঘটলে কোন পক্ষের কী লাভ হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
একজন ‘শীর্ষ’ ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে ‘খুব ভালো’ আলোচনার পর ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মতৈক্য’ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। তবে, অনেকেই এই আলোচনার বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন; বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতার মতো বিষয়গুলো সবার মনে আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে।
ওয়াশিংটন যদি ইরানের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন সেনা পাঠানোর জন্য ট্রাম্পের এই আলোচনার কথা বলার বিষয়টি সময়ক্ষেপণের কৌশলও হতে পারে। ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ; যাকে অনেকেই ট্রাম্পের ইঙ্গিত করা সেই ‘শীর্ষ’ কর্মকর্তা বলে ধারণা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালিবাফ লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে তা থেকে বাঁচতে এই ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে”।
শেয়ারবাজার এবং তেলের দামের প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের জন্যই নয়, ইরানের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে তেহরানের ক্ষেত্রে সুবিধাটি হলো, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ব অর্থনীতির যে ক্ষতি করছে, সেটি। ভবিষ্যতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আক্রমণ ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক খেসারত দিক।
তাই, বাজার শান্ত করার জন্য আলোচনার কথা প্রচার করা যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূলে, তেমনি বিপরীত উদ্দেশ্য হাসিলে এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে কোনো সুযোগ না দিতে আলোচনার বিষয়টিকে ছোট করে দেখানোও ইরানের জন্য লাভজনক।
যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কোথায়?
স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা নিয়ে দুই পক্ষেরই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে এবং তাদের প্রকাশ্য মন্তব্যগুলো থেকে আদৌ কোনো আলোচনা চলছে কি না বা চললেও তা কতদূর এগিয়েছে, সে সম্পর্কে খুব একটা ধারণা পাওয়া যায় না।
বরং এটি আমাদের এই প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায় যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনা থেকে বা সত্যিই যুদ্ধের অবসান ঘটলে উভয় পক্ষের কী লাভ হতে পারে। ট্রাম্প সম্ভবত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুর সঙ্গে শুরু করা এই যুদ্ধের পরিণতি এবং ভেঙে না পড়ে ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন।
গত সপ্তাহে তিনি বলেছেন, “তাদের (ইরানের) মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সব দেশের ওপর আক্রমণ করার কথা ছিল না… কেউ এটা আশা করেনি”। এমনকি “সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞরা”ও এমনটা বিশ্বাস করেননি বলে তিনি দাবি করেন।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ বিশেষজ্ঞরা বারবার এ ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। সেই বিষয়টি বাদ দিলেও, বাস্তবতা এখন ট্রাম্পকে সেই পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করেছে যা তিনি আগে এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
যদিও কিছু মিত্র ও সমর্থক তাকে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে পারে, তবে ট্রাম্প আগেও কঠিন পরিস্থিতি থেকে নিজেকে উদ্ধার করতে চুক্তি করার মানসিকতা দেখিয়েছেন এবং এই ক্ষেত্রেও এমনটা করার সুবিধাগুলো অনুমান করা খুব একটা অবাস্তব নয়।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম শান্ত করার চেষ্টায় ট্রাম্প ইতিমধ্যে তার সরকারকে কিছু ইরানি তেলের ওপর থেকে অস্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম কোনো ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলো এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার যে নীতি ইরান গ্রহণ করেছে, তার ফলেই যে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে, তা বুঝতে ইরানের বাকি থাকার কথা নয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ আগে থেকেই অজনপ্রিয় ছিল, আর এখন তা আরও বেড়েছে; কারণ ভোক্তারা পেট্রোলের দামে এবং সম্ভবত অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে এ বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য কংগ্রেসনাল নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের ফলাফল খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুতরাং, ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি বিকল্প খোলা রয়েছে: হয় তিনি এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খেসারত দেবেন, নয়তো যুদ্ধ শেষ করে সমালোচনার মুখে পড়বেন যে তিনি তার ভাষায় ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ইরানের দৃষ্টিকোণ
তবে ট্রাম্প যা-ই করতে চান না কেন, সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি তার হাতে নেই। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো আক্রমণের শিকার হওয়া ইরান এখন ভবিষ্যতে আরেকটি আক্রমণ ঠেকাতে একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে না তোলা পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয় বলে মনে হচ্ছে।
মার্কিন স্থাপনাগুলোতে আগে থেকে জানিয়ে আক্রমণ করা এবং ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়ানোর সেই দিন এখন আর নেই। বর্তমান যুদ্ধের শুরু থেকেই এটি স্পষ্ট যে ইরান তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে এবং সংযম দেখানোর ব্যাপারে তারা আর আগ্রহী নয়।
নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থে এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করে ওই অঞ্চলে আরও দুর্ভোগ সৃষ্টি করা এখন ইরানের জন্য লাভজনক হতে পারে।
ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থার মজুত কমে আসছে বলেও একটি ধারণা কাজ করতে পারে, যা ইরানকে আরও কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে ইরানের কট্টরপন্থিরা, যারা এখন দেশটির নেতৃত্বে আধিপত্য বিস্তার করছে, তারা মনে করতে পারে যে এখন থামার সময় নয় এবং থামলে ইসরায়েল তাদের ইন্টারসেপ্টর মজুত পুনরায় গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।
তারপরও, ইরান নিজেও ভুগছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এরপর হয়তো বিদ্যুৎ খাতের পালা। উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে এবং বারবার ইরানি আক্রমণের পর সংঘাত শেষে এই সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ইরানের অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী কণ্ঠস্বরগুলো এই পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে ভাবতে পারে যে, পরিস্থিতি সহজেই আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। তারা যুক্তি দেখাতে পারে যে, এক ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা অর্জিত হয়েছে এবং এখন আলোচনার উপযুক্ত সময়।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








