দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্পন্ন হয়েছে শান্তি ও সম্প্রীতির মঙ্গল শোভাযাত্রা। নাটক, গান ও প্রকাশনা উৎসবসহ নানা আয়োজনের মাধ্যমে বরণ করা হয়েছে নববর্ষ ১৪৩০। শোভাযাত্রায় পুতুল, পাখি, বাঘের মুখোশ, পেঁচার মুখোশ, পাখির মুখোশ, রাজা-রানীর মুখোশ ও নানা রকমের মাটির জিনিসপত্র হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) মঙ্গল শোভাযাত্রা, নাটক, গান ও প্রকাশনা উৎসবসহ নানা আয়োজনের মাধ্যমে নববর্ষ ১৪৩০ বরণ করা হয়েছে। এবারের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘শান্তি ও সম্প্রীতি’। শোভাযাত্রায় শান্তির প্রতীক হিসেবে কবুতরের প্রতিকৃতি আর সম্প্রতির প্রতীক হিসেবে লক্ষীপ্যাঁচা স্থান পায়।
শুক্রবার (১৪ এপ্রিল) সকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদুল হক এর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক ঘুরে আবার ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বিভিন্ন ব্যবস্থা ছিল।
শোভাযাত্রা শেষে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে সঙ্গীত বিভাগের আয়োজনে দলীয় সংগীত, লোক সংগীত গাওয়া হয়। ভাষাশহীদ রফিক ভবনের সামনে নাট্যকলা বিভাগের আয়োজনে মঞ্চায়ন করা হয় ‘রায়বেঁশে’। লাঠি ব্যবহার করে এক ধরণের যুদ্ধ নৃত্য হলো এ নাটকটি। এর সাথে যুক্ত হয় নানান রকম শারীরিক কসরত। এছাড়াও মুখ দিয়ে আগুন নিঃসৃত করেও খেলা প্রদর্শিত হয়। এসময় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সকলে আনন্দে নেচে গেয়ে উদ্বেলিত ও উৎফুল্ল হয়ে বর্ষবরণকে আনন্দবহ করে তুলে।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক বলেন, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রুখে দিতে সার্বক্ষণিকভাবে আমাদের সজাগ থাকতে হবে, আমরা শান্তি ও সম্প্রীতি চাই। আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে তবুও আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এগিয়ে যেতে হবে।’
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সামনে ‘প্রকাশনা প্রদর্শনী’ অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ, জার্নাল, সাময়িকী ও বার্তাসহ শিক্ষকদের প্রকাশিত গ্রন্থ স্থান পায়।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ’ শ্লোগানকে সামনে রেখে পহেলা বৈশাখ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালী ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় প্রশাসন ভবন চত্বরে জাতীয় সংগীত, নববর্ষের সংগীত ও ঢাক ঢোল পিটিয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম।
প্রশাসন ভবন চত্বর হতে গ্রাম বাংলার কৃষ্ঠি রং-বেরঙের মুখোশ, পাখি ও বৈশাখী ফেস্টুন নিয়ে এক বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন- উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর হোসেন ভূঁইয়া এবং রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) এইচ.এম.আলী হাসান।
এছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ছাত্র-ছাত্রী, বিভিন্ন সমিতি, পরিষদ, ফোরাম, ছাত্রলীগ ইবি শাখা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ।

সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. তপন কুমার জোদ্দার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শর্মা, আই.আই.ই.আর এর পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মামুনুর রহমান, ইংরেজি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মিয়া মো. রাসিদুজ্জামান, প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহাদৎ হোসেন আজাদ, পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিশে পহেলা বৈশাখ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ ‘বাংলা নববর্ষ’ উদযাপন করা হয়েছে৷ বর্ষবরণের এই আয়োজনের মধ্যে ছিলো মঙ্গল শোভাযাত্রা, শুভেচ্ছা বক্তব্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্য বলী খেলা, বউচি খেলা ও মোরগ লড়াই।

সকাল ১০ টায় ক্যাম্পাসের স্মরণ চত্বর থেকে উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের নেতৃত্বে মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শোভাযাত্রা শেষে মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বেলা ১২ টায় আলোচনা সভায় উপাচার্য তাঁর ভাষণে উপস্থিত সকলকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন,” নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।”
অনুষ্ঠান শেষে উপাচার্য গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী আয়োজনসমূহে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন৷
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপ-উপাচার্য, সিন্ডিকেট সদস্যবৃন্দ, চবি শিক্ষক সমিতি নেতৃবৃন্দ, অফিসার সমিতি, কর্মচারী সমিতি, কর্মচারী ইউনিয়ন, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি’ প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বর্ষবরণ ও পহেলা বৈশাখ- ১৪৩০ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে সকাল দশটায় ‘জাতীয় সংগীত’ এবং ‘এসো হে বৈশাখ’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে উপাচার্যের নেতৃত্বে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধন করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ করে অমর একুশের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়।

এসময়, উপাচার্য তাঁর ভাষণে বলেন, ‘বাঙলা নববর্ষ উৎসব বাঙালি জাতিসত্ত্বার অবিচ্ছেদ্য অংশ। পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন আমাদের গর্ব।’
উপাচার্য বিগত বছরের গ্লানি-ব্যর্থতা পেছনে ফেলে নবশক্তি ও উদ্যোমে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
শোভাযাত্রায় অন্যান্যদের মধ্যে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক শেখ মো. মনজুরুল হক, রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. রাশেদা আখতারসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হল প্রভোস্ট, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, মহিলা ক্লাবের সদস্যবৃন্দ ও জাবি স্কুল ও কলেজের ছাত্র-শিক্ষকগণ অংশগ্রহণ করেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে সারা দেশজুড়ে নানা আয়োজনে বাংলা নতুন বর্ষ ১৪৩০-কে বরণ করে নেয় বাঙালি জাতি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ও (কুবি) এর ব্যতিক্রম নয়। তবে পবিত্র মাহে রমজানের কারণে অন্যান্য বছরের তুলানায় এবারের আয়োজন ছিল স্বল্প পরিসরে।
সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিনটিকে বরণ করে নেয়। শোভাযাত্রাটি প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার প্রশাসনিক ভবনের সামনে শেষ হয়।
শোভাযাত্রা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অফিসে বাঙালির সংস্কৃতি ও দেশপ্রেমের সাথে মিশে থাকা বিভিন্ন গান, কবিতা গেয়ে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন সকলে।
নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় জীবনে একটি উৎসব মুখর দিন। দিনটি বাঙালি জাতির সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে। প্রতি বছরই আমরা দিনটি পালন করে থাকি, তবে এবছর রমজানের কারণে দিনটিকে স্বল্প পরিসরে উদযাপন করা হয়েছে। আমরা দিনটি উপলক্ষে ছাত্র শিক্ষক মিলে একটা শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি, শুভেচ্ছা বিনিময়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও দেশপ্রেম সম্পৃক্ত বিভিন্ন গান কবিতা পরিবেশন করা হয়েছে। আমি মনে করি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় দিনটি যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করেছে।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এন এম রবিউল আউয়াল চৌধুরী, আইকিউএসির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রশিদুল ইসলাম শেখ, শাখা ছাত্রলীগ দু’টি গ্রুপের বিভিন্ন নেতাকর্মী ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
উল্লেখ্য, বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে রেইনবো পেইন্টসের সহযোগিতায় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র গ্রাফিতি সংগঠন বৃত্ত কুবি’র উদ্যোগে গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে শুরু করে গোল চত্ত্বর পর্যন্ত আলপনা আকাঁ হয়েছে।








