যৌন পাচার মামলায় অভিযুক্ত জেফ্রি এপস্টিনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ গত দুই মাসে লাখ লাখ নথি প্রকাশ করলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন চাইছেন দেশটি যেন এই অধ্যায় পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। তবে প্রশ্ন উঠছে—এই বিতর্ক আদৌ কি এত সহজে শেষ হওয়ার?
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ জানিয়েছেন, কংগ্রেসে গত নভেম্বরে পাস হওয়া একটি আইনের আওতায় বাধ্যতামূলকভাবে শুরু হওয়া এপস্টিন–সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা শেষ হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নথিতে নতুন করে কোনো মামলা করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
রোববার ব্ল্যাঞ্চ বলেন, এখানে বিপুল পরিমাণ চিঠিপত্র, অসংখ্য ইমেইল ও ছবি রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই কাউকে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করার সুযোগ তৈরি করে না।
যদিও বিচার বিভাগের পর্যালোচনা শেষ হয়েছে, ক্যাপিটল হিলে প্রতিনিধি পরিষদে এপস্টিন–সংক্রান্ত তদন্ত এখনো চলমান। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে সাক্ষ্য দিতে তলব করা হয়েছে। রিপাবলিকানদের কংগ্রেস অবমাননার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকির পর তারা সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন।
একই সঙ্গে কংগ্রেসের সদস্য এবং এপস্টিনের ভুক্তভোগীরা দাবি জানাচ্ছেন—এখনও এমন অনেক নথি রয়েছে, যা প্রকাশ করা হয়নি। এসব দাবি আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, ট্রাম্পসহ যারা এই অধ্যায় থেকে সরে যেতে চান, তাদের জন্য বিষয়টি ঝেড়ে ফেলা কতটা কঠিন।
আপাতত এই ঝড় থেকে দৃশ্যত বড় কোনো রাজনৈতিক ক্ষতি ছাড়াই বেরিয়ে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে নথিতে যাদের ক্ষেত্রে এপস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিস্তারিত উঠে এসেছে—বিশেষ করে যারা ২০০৮ সালে এপস্টিন দণ্ডিত যৌন অপরাধী হওয়ার পরও তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন—সেসব প্রভাবশালী ব্যক্তির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।
এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক যুবরাজ অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর, যুক্তরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসন এবং সাবেক মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ল্যারি সামার্স। এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তাদের প্রত্যেককেই ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিণতির মুখে পড়তে হয়েছে।
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কসহ আরও অনেকে প্রকাশিত ইমেইল ও নথিতে নিজেদের নাম থাকার ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছেন।
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প বলেন, তার মতে এখন দেশের উচিত অন্য বিষয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এপস্টিন–সংক্রান্ত কোনো অনিয়মের অভিযোগ তিনি বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। ট্রাম্প বলেন, আমার সম্পর্কে কিছুই বের হয়নি।
তবে প্রকাশিত নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টিন–সংক্রান্ত নথিতে ছয় হাজারেরও বেশি বার ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এপস্টিন ও তার সহযোগীরা প্রায়ই তাকে উল্লেখ করেছেন। নিউইয়র্ক ও ওয়েস্ট পাম বিচভিত্তিক এই দুই ব্যক্তির মধ্যে নব্বইয়ের দশকজুড়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। ট্রাম্পের দাবি, ২০০০ সালের শুরুর দিকেই সেই সম্পর্কের অবসান ঘটে।
গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি ইমেইল বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ২০১১ সালে দণ্ডিত এপস্টিন তার সহকারী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলকে লেখা ওই ইমেইলে উল্লেখ করেন, আমি চাই তুমি বুঝতে পারো—নথিতে ট্রাম্পের নাম না থাকাটাই একটি সংকেত।
সর্বশেষ প্রকাশিত নথিতে বিচার বিভাগ এফবিআইয়ের যাচাই না করা কিছু তথ্যসূত্রের তালিকাও যুক্ত করেছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের কিছু অভিযোগ রয়েছে—যে সময় ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এসব অভিযোগের অধিকাংশের সঙ্গেই কোনো সহায়ক প্রমাণ ছিল না।
শনিবার এসব তথ্যসূত্র সাময়িকভাবে বিচার বিভাগের নথি–ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে কিছু মহলে ধারণা তৈরি হয়—প্রেসিডেন্টকে রক্ষায় বিচার বিভাগ কাজ করছে।
তবে বিচার বিভাগ জানায়, এসব নথিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসত্য ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে, যা ভিত্তিহীন। বিভাগটির দাবি, এসব অভিযোগের সামান্য বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকলে এত দিনে সেগুলো রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
নতুন প্রকাশিত ছবিগুলোও দীর্ঘদিন ধরে জনসমক্ষে থাকা ছবি ও ভিডিওর বাইরে নতুন কিছু নয়। আর ইমেইল ব্যবহারে অনাগ্রহী হওয়ায় এপস্টিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগের কোনো নথিভুক্ত প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টি হলো—২০০২ সালে এপস্টিনের জন্মদিন উপলক্ষে একটি বইয়ে ট্রাম্পের নামে একটি অশালীন নোট থাকার দাবি। তবে এটি সরকারের নয়, এপস্টিন এস্টেটের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয় এবং ট্রাম্প ওই নোটের সত্যতা জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণ না পাওয়ার অর্থ হতে পারে—বিচার বিভাগ ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু নথি গোপন করেছে। সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকাশিত নথিতে সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের মেমো, করপোরেট সুরক্ষা–সংক্রান্ত নথি এবং পাম বিচ পুলিশ বিভাগের মূল প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত আছে কি না।
এপস্টিনের এক ভুক্তভোগী লিসা ফিলিপস বিবিসিকে বলেন, বিচার বিভাগের পদক্ষেপে ভুক্তভোগীরা সন্তুষ্ট নন। তার ভাষায়, অনেক নথি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেছে এবং বহু ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ করা হয়েছে—যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের অনীহার কারণে ট্রাম্প-সমর্থকদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হলেও বিষয়টি এখানেই শেষ হচ্ছে না। ডেমোক্র্যাটরা প্রকাশিত নথির সম্পূর্ণ ও অসম্পাদিত সংস্করণ দেখতে চাইছেন। পাশাপাশি ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য নতুন রাজনৈতিক আলোড়ন তুলতে পারে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
প্রেসিডেন্ট যতই বলুন না কেন যে দেশের এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে, এপস্টিনের মৃত্যুর বহু বছর পরও এই কাহিনি প্রমাণ করছে—এটি এখনো শেষ হয়নি।








