মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক সংঘাত সমাধানের লক্ষ্যে ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সনদ ঘোষণা করেছেন।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) মঞ্চে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই বোর্ডের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের দুই বছরের সামরিক অভিযানের পর গাজা পুনর্গঠনের তদারকির উদ্দেশ্যে বোর্ডটি গঠনের কথা বলা হলেও, ১১ পৃষ্ঠার সনদে একবারও গাজার নাম উল্লেখ নেই। বরং ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই বোর্ড ভবিষ্যতে জাতিসংঘের ঐতিহ্যগত ভূমিকায় থাকা বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলাতেও সক্রিয় হতে পারে।
ডব্লিউইএফ মঞ্চে ট্রাম্প বলেন, এই বোর্ডটি পুরোপুরি গঠিত হলে আমরা যা চাই, তাই করতে পারব। অনুষ্ঠানে আর্জেন্টিনা, কাতার, আজারবাইজান, ইন্দোনেশিয়া, হাঙ্গেরি, মরক্কো, বাহরাইন, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ ১৯টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জাতিসংঘকে পাশ কাটানোর আশঙ্কা
শান্তি বোর্ড জাতিসংঘকে দুর্বল করতে পারে এমন উদ্বেগও প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন মহলে। তবে ট্রাম্প তার বক্তব্যে বলেন,
এই উদ্যোগ জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করবে।
একইসঙ্গে জাতিসংঘের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জাতিসংঘের বিপুল সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তারা তা কাজে লাগাতে পারেনি।
ট্রাম্প গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রশংসা করে দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে এখন শান্তি আছে। যা একসময় অসম্ভব মনে করা হতো।
এরপর বক্তব্য দেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, বোর্ডের প্রাথমিক লক্ষ্য গাজায় শান্তি চুক্তি স্থায়ী করা হলেও এর সম্ভাবনা “অন্তহীন”। এটি কেবল শান্তি বোর্ড নয়, এটি একটি কর্ম বোর্ড। যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন কর্মমুখী সভাপতি, বলেন রুবিও।
গাজা পুনর্গঠনের ‘মুক্ত বাজার’ মডেল
ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউসের সিনিয়র উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার গাজা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তবে সেখানে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের কোনো উল্লেখ ছিল না।
কুশনার বলেন, নিরাপত্তা ছাড়া কেউ বিনিয়োগ করবে না। ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ চলছে, আর পরবর্তী ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, শান্তি বোর্ড গাজার বিদেশি সহায়তা নির্ভরতা কমাতে ‘মুক্ত বাজার নীতি’ প্রয়োগ করতে চায়। উপস্থাপিত মানচিত্রে গাজাকে ‘আবাসিক অঞ্চল’ ও ‘উপকূলীয় পর্যটন অঞ্চল’-এ ভাগ করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় রাফায় ১ লাখ আবাসন ইউনিট নির্মাণ এবং ‘নতুন গাজা’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।“মধ্যপ্রাচ্যে তিন বছরে বড় শহর গড়া অসম্ভব নয়,” বলেন কুশনার।

নেতৃত্ব কাঠামো ও সদস্যপদ
বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বে থাকবেন ট্রাম্প নিজেই। শীর্ষে থাকবে একটি ‘প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিষদ’, যেখানে থাকছেন মার্কো রুবিও, জ্যারেড কুশনার, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান।
স্থায়ী সদস্যপদ পেতে দেশগুলোকে ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখতে হবে বলে জানানো হয়েছে, যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন—এই অবদান স্বেচ্ছাসেবী।
পাকিস্তান, মিসর, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া বোর্ডে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। তবে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন ও স্লোভেনিয়া এই উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।
পুতিন ও নেতানিয়াহুকে ঘিরে বিতর্ক
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে বোর্ডে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যা বিতর্ক আরও উসকে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, ইউক্রেনে শান্তির কোনো প্রতিশ্রুতি না থাকলে পুতিনের মতো নেতার অংশগ্রহণ নিয়ে আমাদের গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি জনগণের সহায়তায় বোর্ডে ১ বিলিয়ন ডলার দিতে প্রস্তুত মস্কো।
ফিলিস্তিনিদের অনুপস্থিতি ও গাজার প্রতিক্রিয়া
শান্তি বোর্ডে কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি না থাকায় তীব্র সমালোচনা উঠেছে। গাজা থেকে আল জাজিরার তারেক আবু আযম জানান, ফিলিস্তিনিদের মানুষ হিসেবে নয়, একটি ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা পরিচালনা করা হবে। তার ভাষায়, মাঠের বাস্তবতা থেকে এই বোর্ড বিচ্ছিন্ন বলেই মনে করছেন গাজার মানুষ।
যদিও ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির পর গাজায় সহায়তা প্রবাহ বৃদ্ধির দাবি করেছেন, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখনও তীব্র মানবিক সংকটের কথা জানিয়ে আসছে।







