এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
প্রায় দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে বৈঠকে বসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। হোয়াইট হাউসে চতুর্থবারের মতো বৈঠক দুই দেশের ‘লৌহবন্ধনের’ শক্তি ও সীমা উভয়কেই পরীক্ষা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রোববার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প “মধ্যপ্রাচ্যে মহত্ত্ব” এবং “বিশেষ কিছু” ঘটার ইঙ্গিত দিয়ে পোস্ট করেছেন। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটানোর সময় এসে গেছে। নেতানিয়াহুও ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে ইসরায়েল।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনের ফাঁকে আরব ও মুসলিম নেতাদের কাছে একটি ২১ দফা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা উপস্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি ও পশ্চিমা গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, প্রস্তাবনায় হামাসকে গাজার অবশিষ্ট ৪৮ জন বন্দীকে দুই দিনের মধ্যে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, হামাস যোদ্ধাদের হয় গাজা ত্যাগ করতে হবে, নয়তো তারা প্রতিরোধ ত্যাগ করলে সাধারণ ক্ষমা পাবে। দুর্ভিক্ষে জর্জরিত গাজায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। কিছু ফিলিস্তিনি বন্দীকে ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে।
হামাস জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত মিশর ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে নতুন কোনো প্রস্তাব পায়নি। তবে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে নতুন প্রস্তাব বিবেচনা করতে তারা প্রস্তুত। একই সঙ্গে কাসাম ব্রিগেড সতর্ক করেছে, গাজা শহরে দুই ইসরায়েলি বন্দীকে আটকে রাখা দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং অব্যাহত স্থল ও বিমান হামলায় প্রতিদিন ডজন ডজন ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন।
এই পরিকল্পনা নেতানিয়াহুর সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ এতে ভবিষ্যতে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখার কথা বলা হয়েছে—যা ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থী নেতারা কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নন।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বহিষ্কার করা হবে না এবং তারা চাইলে যুদ্ধের পর গাজায় ফিরে আসার অধিকার পাবে। কিন্তু নেতানিয়াহুর জোটের মূল অংশীদার অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির গাজার সম্পূর্ণ ধ্বংস ও স্বেচ্ছা অভিবাসনকে উৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
তাদের দাবি, খাদ্য, পানি ও ওষুধ প্রবেশ বন্ধ রেখে গাজাকে আরও দুর্বল করা হোক এবং পশ্চিম তীরের মতো গাজাতেও অবৈধ ইসরায়েলি বসতি পুনর্নির্মাণ করা হোক। তারা ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে হামাসকে নির্মূল না করেই যুদ্ধের লক্ষ্য পরিত্যাগ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ৩২ আসনের লিকুদ দলের জোট বর্তমানে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ১২০ আসনের মধ্যে মাত্র ৬০ আসন ধরে রেখেছে। অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর দুটি ইতোমধ্যেই জোট ত্যাগ করেছে এবং স্মোট্রিচ ও বেন-গভিরের ১৩ আসনের সমর্থন হারালে সরকারের পতন ও আগাম নির্বাচনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতিবাদে বেন-গভির এর আগেও জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। পরে ইসরায়েল পুনরায় গাজায় হামলা শুরু করলে তিনি আবার সরকারে ফিরে আসেন।
গাজার যুদ্ধের অবসান ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই বৈঠক মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও তা নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ ও পরিকল্পনার প্রতি নেতানিয়াহুর সাড়া জোট সরকারকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে, আর সেই সঙ্গে গাজার ভবিষ্যতের চিত্রও অনেকটাই বদলে যেতে পারে।









