ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতর বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অনেক শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় ঢাকার মত জনবহুল শহরের ওপর প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ।
কেন শহরের ওপর দিয়েই এসব ট্রেনিং ফ্লাইট চালানো হয়—এই প্রশ্নে বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশিক্ষণের বাস্তবতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে এতে ঝুঁকি কমাতে আরও কঠোর নিরাপত্তা ও নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।
মাইলস্টোন স্কুল ভবনে বিমান বাহিনীর উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে; দগ্ধ ও আহত হয়েছে দেড় শতাধিক। নিহতদের মধ্যে ১৭ জন শিশু থাকার তথ্য দিয়েছেন স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।
বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতির এই শহরে প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগামাধ্যমে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি দায়ী কর্তপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি ওঠেছে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তার ফেইসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, “কেন জনবহুল এলাকায় যুদ্ধ বিমানের প্রশিক্ষণ চালানো হয় তার জবাব দিতে হবে, এর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নিহত ও আহতদের সঠিক পরিসংখ্যান দিতে হবে।”
জনবহুল এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন খোদ নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনও।
তিনি বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে বিমান প্রশিক্ষণ কোথায় হবে, তা নতুন করে ভাবতে হবে। দুর্ঘটনা এড়াতে প্রশিক্ষণের বিষয়ে সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরও যাচাই-বাছাই করতে হবে।’
বিমান চলাচল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশিক্ষণ ফ্লাইট শুধু আকাশে উড়া শেখানো নয়—এটি বাস্তব পরিবেশে সিদ্ধান্ত নেওয়া, জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং ব্যস্ত আকাশপথে নিরাপদে উড্ডয়ন ও অবতরণের প্রস্তুতি।
বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত এয়ারভাইস মার্শাল ও দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘শুধু প্রশিক্ষণ বিমান না, যে কোনো বিমানের জন্যই উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় ও পথ দুটোই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটা মাটির খুব কাছে থাকে। এই সময় বেশি কৌশল প্রয়োগ করার সুযোগ থাকে না। নিয়ন্ত্রণ থাকে না বৈমানিকের, যে কিছু সমস্যা হলে সরে যাবে। আর গতিও কম থাকে, উচ্চতাও কম থাকে। আর যুদ্ধ বিমান অচল হয়ে গেল তো ঠাস করে পড়ে যাবে।’’
“এজন্য বিমান বন্দরগুলোর ওড়ার ও নামার পথে ভবনের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। যখন একটা বিমানবন্দর তৈরি করা হয়, বর্তমান যুগে নগর পরিকল্পনায় ওড়ার ও নামার পথে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এগুলো দেওয়া হয় না। এর একটা কারণ হচ্ছে ঝুঁকি, আরেকটা কারণ হচ্ছে শব্দ।”
সাবেক বাণিজ্যিক পাইলট ক্যাপ্টেন (অব.) রাশেদ মাহমুদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “শিক্ষানবিশ পাইলটদের শুধু ফাঁকা আকাশে উড়াল দিলেই হবে না। তাদের ব্যস্ত এয়ারস্পেস, কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনা এবং নগরের জটিল পরিবেশে অভ্যস্ত হতে হয়। তবে এর মানে এই নয় যে জননিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে আলাদা করে প্রশিক্ষণ জোন তৈরি করা কঠিন। অধিকাংশ বিমানবন্দর শহরের খুব কাছাকাছি। নির্দিষ্ট “ট্রেনিং এয়ারস্পেস” নেই। নতুন এয়ারফিল্ড গড়তে জমির সংকট ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। ফলে বাধ্য হয়েই কর্তৃপক্ষকে নগরের আশপাশেই প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনা করতে হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চেষ্টা করি কম ঝুঁকিপূর্ণ রুট ও সময় বেছে নিতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—শহরকে পুরোপুরি এড়িয়ে উড্ডয়ন পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব।”
নগরবাসীর বড় অংশ মনে করছেন, আকাশে প্রশিক্ষণ বিমানের ঘনঘন উড্ডয়ন তাদের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করছে। বিমানবন্দরের পাশের এলাকা আশকোনার বাসিন্দা ইমরান হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “আমরা তো জানি না—ওটা ট্রেনিং প্লেন নাকি নিয়মিত ফ্লাইট। কিন্তু নিচু দিয়ে উড়লে ভয় লাগে। দুর্ঘটনা হলে আমরা কোথায় যাব?”
এদিকে, এভিয়েশন সিস্টেম পরিবর্তন করে ঢাকাসহ দেশের সব জনবহুল এলাকায় বিমান উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ বিমান উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা কেন দেওয়া হবে না, রুলে তা-ও জানতে চেয়েছেন আদালত।
এছাড়াও আদালত দেশে বর্তমানে ত্রুটিপূর্ণ বিমানের সংখ্যা কত, কেন তা প্রকাশ করা হবে না এবং ত্রুটিপূর্ণ বিমান রক্ষণাবেক্ষণে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা-ও জানতে চেয়েছেন।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে দায়ের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
প্রশিক্ষণ ফ্লাইট ছাড়া দক্ষ পাইলট তৈরি সম্ভব নয়—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণ যদি জনবহুল নগরের মানুষের জীবনের জন্য অযথা ঝুঁকি তৈরি করে, তবে সেটি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন দরকার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতিমালার আধুনিকায়ন—যাতে আকাশে দক্ষ পাইলট তৈরি হয়, আবার মাটিতে থাকা মানুষও থাকে নিশ্চিন্তে।








