তেলাপাকো দমনে ঘরে কীটনাশকের প্রয়োগে শিশুমৃত্যুর মতো ঘটনা দেশের মানুষকে বেদনার্ত করেছিল। এক্ষেত্রে সচেতনতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিষাক্ত রাসায়নিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকবেই। তাই কতটা কম ক্ষতি হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। বর্তমানে চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের পেস্টিসাইডে (বালাইনাশক) প্রাণঘাতী পদার্থের বিকিরণ কম থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে আসছে। তবে কোন কীটনাশকই যাচাই বাছাই ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, খাবারে কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, চর্মরোগ, স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করা, চোখ জ্বালাসহ হতে পারে অন্তত ২০০ প্রজাতির রোগ। কীটনাশক ব্যবহৃত ফল-ফসল আক্রান্ত করতে পারে ভোক্তাদের।
তাই বলে কি শাক-সবজি থেকে নিত্যদিনের খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতন হতে হবে, আতঙ্কের কিছু নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার উপপরিচালক (বালাইনাশক মান নিয়ন্ত্রণ) শরীফ উদ্দিন আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: শাকসবজিতে যে পেস্টিসাইড (বালাইনাশক) বর্তমানে ব্যবহার করা হচ্ছে তা চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের। এসবে যে বালাইনাশক ছিটানো হয় সেখানে প্রাণঘাতী পদার্থের বিকিরণ থাকে না। তবে সচেতনতার বিকল্প নেই। এখন মানুষ এসব বিষয়ে খুব সচেতন।

তিনি বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশকে বিষাক্ত জৈব রাসায়নিক ডিডিটি (ডাইক্লোরো ডাফেনাইল ট্রাইক্লোরেথেন) মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এক সময় আমাদের দেশে লাল মার্কিংয়ের বেশি পেস্টিসাইড পাওয়া যেত, যেগুলো মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর বিষ ছিল। মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারত। এছাড়া এই পেস্টিসাইডগুলো পরিবেশের জন্যও ক্ষতির কারণ ছিল। মানবদেহ ও পরিবেশের বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমরা এখন চতুর্থ প্রজন্মের সবুজ পেস্টিসাইড ব্যবহার করছি। এটাও বিষ। তবে এই বিষগুলোর শ্রেণী নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেমন আগে ছিল পাখাওয়ালা পোকার জন্য যে বিষ ব্যবহার করা হতো সেগুলোতে মশা, মাছি, উইপোকা, তেলাপোকা সব মারা যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এখন মশা মারার জন্য যে বিষ ব্যবহার করা হচ্ছে সেটাতে শুধু মশাই মারা যাবে। বর্তমানে পেস্টিসাইড পঞ্চম প্রজন্মেও চলে এসেছে। বাজারে বর্তমানে অধিকাংশ পেস্টিসাইড সবুজ, কিছু আছে হলুদ। হলুদ বিষ কিছুটা ক্ষতিকর, ব্যবহার সাবধানে করতে হবে। তবে কোন বিষই যাচাই বাছাই ও না বুঝে ব্যবহার করা উচিত নয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: কোন ধরণের কীটনাশক জনস্বার্থে ব্যবহার করা যাবে তা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় অনুমোদন দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। জনস্বার্থে ব্যবহার করা কীটনাশক ছাড়া এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়া কোন কীটনাশক ব্যবহার করাটাই ঠিক না। কীটনাশক ব্যবহারে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ লোক দিয়ে কীটনাশক প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রতিটি কীটনাশকের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা এবং ব্যবহারের কিছু নিয়ম আছে। নিয়ম মেনে কীটনাশক ব্যবহার না করলে সেটি ভয়ংকর ফল বয়ে আনতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ পারভেজ জাবিন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, রাসায়নিক কীটনাশকের মাধ্যমে যে মানবদেহের বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। এসবে উপাদানে সঠিক মাত্রা থাকে না। ব্যবহারকারীরা সচেতন থাকলেই সমস্যার সমাধান ঘটবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের নজরদারিতার প্রয়োজন রয়েছে।
দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যে বিষাক্ত ‘থ্যালেটস’
থ্যালেটস বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের একটি গ্রুপ যা প্লাস্টিককে টেকসই করতে ব্যবহার করা হয়। এদেরকে চিকিৎসা প্লাস্টিসাইজার বলে। দৈনন্দিন ব্যবহারের ভিনাইল ফ্লোরিং, লুব্রিকেটিং তেল এবং সাবান, শ্যাম্পু, চুলের স্প্রেতে এটি পাওয়া যায়। এছাড়াও প্রসাধনী এবং প্লাস্টিক, কাগজের আবরণ, পেইন্ট ও আঠালো দ্রব্যে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। শ্যাম্পু, বডি ডিওডরেন্ট, বডি ওয়াশ, হেয়ারস্প্রে ও হেয়ার জেলেও এটি থাকে।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন- এসডো ’র নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, থ্যালেটস শরীরের হরমোনগুলোকে নকল করে বা ব্লক করে প্রভাবিত করে। এগুলো শরীরের ইস্ট্রোজেন, টেস্টোস্টেরন এবং অন্যান্য হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রায় হস্তক্ষেপ করে। এসব পদার্থের এক্সপোজার সীমিত করা উচিত যতক্ষণ পর্যন্ত না এসব ব্যবহার সীমিত করার জন্য যথাযথ আইন আরোপ করা হচ্ছে।
ক্যাশ রিসিটে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বিসফেনল
বিসফেনল এ বা বিপিএ- মানবদেহে অনেক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন স্তন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, ডায়াবেটিস এবং ওবেসিটি। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন- এসডো’র গবেষণা দল বলছে, প্রায় ৯৭ শতাংশ ক্যাশ রিসিপ্ট থার্মাল কাগজ দিয়ে তৈরি করা হয় এবং এই ৯৭ শতাংশ থার্মাল কাগজের মধ্যে ৬৯ শতাংশতে বিপিএ এবং ২৬ শতাংশে বিপিএস পাওয়া গেছে।
গবেষণা মতে, বিপিএ এবং বিপিএস এস্ট্রোজেন এবং থাইরয়েড হরমোনের মতো দেহের অন্যান্য হরমোনগুলোকে নকল করে শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট করে। এই রাসায়নিক পদার্থগুলো রিসিপ্টে পাউডার হিসেবে থাকে, যা সহজেই মানুষের আঙুলের সংস্পর্শে আসতে পারে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, রিসিপ্টগুলো স্পর্শ করার দুই ঘণ্টা মধ্যেই মানুষের প্রস্রাবে এই পদার্থগুলোর উপস্থিতি দেখা যায়। এতে প্রমাণ হয়, ক্যাশিয়ার এবং অন্যান্য কর্মী যারা থার্মাল কাগজ সবসময় ব্যবহার করে যাচ্ছেন, তাদের দেহে অন্যদের তুলনায় এই রাসায়নিক পদার্থগুলো বেশি থাকে। গর্ভবতী কর্মী যারা ক্যাশ রিসিপ্ট নিয়ে কাজ করেন তাদের ভ্রূণ এসব পদার্থের সংস্পর্শে আসার কারণে শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বিপিএ বেশিরভাগই পলিকার্বোনেট প্লাস্টিক, ইপক্সি রেজিন এবং থার্মাল কাগজ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। কাজেই জনগণকে বিপিএ সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত রাখার জন্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে গ্লাস বা স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করা উচিত। যেহেতু শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিপিএর সংক্রমণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তাই স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো অবশ্যই মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।








