এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বাংলাদেশ সরকারের সামগ্রিক ঋণ ২১ ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছে। বিগত বহু বছর ধরে ক্রমাগত রাজস্ব আয়ের দুর্বলতা ও নানা উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ জমতে জমতে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। সরকারি ঋণ বৃদ্ধি, সুদ ব্যয়ের চাপ, বৈদেশিক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা এবং সরকারি গ্যারান্টির পরিমাণ বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
অর্থ বিভাগের ঋণ বুলেটিন (১৫ নভেম্বর) অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন টাকা- যা গত বছরের (২০২৪) একই সময়ের ১৮ দশমিক ৮৯ ট্রিলিয়ন টাকার তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। আবার ২০২৩ সালের এই সময়ে এই ঋণ ছিলো ১৬ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন টাকা। আর ২০২২ সালে ছিলো ১৩ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন টাকা।
এ সময়ে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৪৯ ট্রিলিয়ন টাকা, মোট ঋণের ৪৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০২১ সালে যা ছিল মাত্র ৪ দশমিক ২০ ট্রিলিয়ন টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন টাকায়- গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণেরও বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, করোনা মহামারির পর বাজেট সহায়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল এবং মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্পে ব্যাপক অর্থায়নই এ ঋণবৃদ্ধির প্রধান কারণ।
সুদ পরিশোধের চাপ
সরকারের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৭০ হাজার ৯শ’ ৭৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে সবথেকে বেশি ২৯ শতাংশ এসেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (বিশ্ব ব্যাংক) থেকে। এরপর এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক ২৩ শতাংশ, জাপান ১৮ শতাংশ, রাশিয়া ১১ শতাংশ, চীন ১১ শতাংশ, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ৩ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য বৈদেশিক উৎস থেকে সরকারের ঋণ রয়েছে ৮ শতাংশ।
ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সুদ পরিশোধও। গত অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা- যা এক বছরে ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি। বৈদেশিক ঋণের সুদ ২১ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১৬ শতাংশ বেড়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ট্রেজারি বিল–বন্ডের সুদ পরিশোধ গত বছর আগের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনো বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ আইএমএফের নিরাপদ সীমার ভেতরে থাকলেও ধারাবাহিক ঋণ বৃদ্ধি, রাজস্ব ঘাটতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিবেচনায় ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়বে। তাই ঋণ ব্যবস্থাপনায় অধিক সতর্কতা, নতুন প্রকল্প বাছাইয়ে কঠোরতা, প্রকল্প বাস্তবায়নগত দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় জোরদার এবং রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও ঋণের গঠন, সুদ ব্যয়ের ধারা, বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা এবং গ্যারান্টির চাপ ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হয়ে উঠছে।








