ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় যোগ দিতে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসেন ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা। এসময় তেহরানের জনাকীর্ণ গ্র্যান্ড মোসাল্লার চত্বরে পোস্টার ও গ্রাফিতিতে এমনকি সমবেত জনতার মুখেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার স্লোগান প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
সোমবার (৬ জুলাই) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে আয়োজিত এই জানাজায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান জেনারেল আহমেদ ভাহিদি এবং প্রয়াত খামেনির অন্য তিন ছেলে প্রকাশ্যে উপস্থিত হন। তবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি নিরাপত্তার কারণে এখনো আত্মগোপনেই রয়েছেন বলে জানা যায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিশৃঙ্খলার কারণে চার মাসেরও বেশি সময় বিলম্বের পর তেহরানের জনাকীর্ণ গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রার্থনা চত্বরে খামেনি এবং তার পরিবারের আরও চার সদস্যের জন্য এক সপ্তাহব্যাপী গণ জানাজার আয়োজন করা হয়েছে।

এই জানাজা শোক ও প্রতিশোধের আহ্বানের মিশ্রণে এক রাজনৈতিক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। রোববার সকাল ৮টায় জানাজার নামাজে অংশ নিতে অনেকেই ভোরের অনেক আগেই পৌঁছেছেন। আবার লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে অনেকে সারারাত মসজিদে অবস্থান করেছেন। এসময় প্রতিশোধের প্রতীক ইরানের ত্রিবর্ণ ও লাল পতাকা এবং তাদের প্রিয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ছবি হাতে নিয়ে মানুষজন প্রতিশোধের আহ্বান জানিয়ে “আমেরিকার মৃত্যু হোক” এবং “ইসরায়েলের মৃত্যু হোক” বলে স্লোগান দিয়েছেন।
জানাজার আনুষ্ঠানিকতার সময় অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করা উপস্থাপক ও কবি মোহাম্মদ রাসুলি লাউডস্পিকারের মাধ্যমে প্রকাশ্যে বলেন, “এখন থেকে কাফনই আমাদের পোশাক। আমি তোমাদের রক্তের কসম খেয়ে বলছি; ট্রাম্পের হত্যা আমাদের দায়িত্ব। পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য লোকটা এখনও বেঁচে আছে কেন? পৃথিবীটা ট্রাম্পের জন্য নয়। যে আমাদের ইমামকে হত্যা করেছে, আমরা কেন তাকে হত্যা করব না? যদি আমরা তা না করি, তবে তা হবে লজ্জার বিষয়।”
আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত খলিল শিরঘোলামি তার এক্স অ্যাকাউন্টে লেখেন, “তোমরা মানুষ হত্যা করতে পারো, কিন্তু আদর্শকে হত্যা করতে পারো না। তোমরা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করেছ, কিন্তু বাস্তবে তোমরা একটি সুগন্ধির বোতল ভেঙেছ, যার সুবাস এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তোমরা এটা কখনোই বুঝবে না কারণ তোমাদের কোনো সভ্যতা নেই, কোনো ইতিহাস নেই, কোনো সম্মান নেই।”
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদর বলেন, “জনগণ তাদের নেতাকে বিদায় জানাতে দুটি স্লোগান দিচ্ছে: শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ইরানের শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ।”
ইসরায়েলের ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যার হুমকির মধ্যেই খামেনির জানাজায় রোববার ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং খামেনির অন্য পুত্র মাসুদ, মেইসাম ও মোস্তফা এবং বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর প্রধান জেনারেল আহমদ ভাহিদি জনসমক্ষে আসেন, যাদের যুদ্ধের পর থেকে দেখা যায়নি।
এসময় ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ—যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন—এবং আধাসামরিক বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর অভিজাত কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানিও উপস্থিত ছিলেন।
স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষ করার আলোচনায় ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি প্রত্যাখ্যান করছে, তখন তাদের উপস্থিতি ঐক্য, প্রতিরোধ এবং নিজেদের নিরাপত্তার প্রতি আস্থার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
৯৭ বছর বয়সী শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রয়াত খামেনি এবং তার পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল ও ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানীসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের জন্য জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। এসময় অন্যান্য কফিনের তুলনায় খামেনির নাতনির কফিনটি ছিল এই জানাজা অনুষ্ঠানের অন্যতম মর্মস্পর্শী দৃশ্য।
সোমবার তেহরানের রাস্তা দিয়ে খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ বহনকারী কফিন ইরান ও প্রতিবেশী ইরাকের বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়ার হবে পরিকল্পনা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শোক পালনের জন্য ইরানের রাস্তাঘাট, আকাশপথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার খামেনির জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করার পর এই শোক পালন শেষ হবে।

