৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ব্যাপক হামলা শুরু করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। আর এই হামলার মাস্টারমাইন্ড হলেন হামাসের কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফ, যিনি ইসরায়েলের মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তি। হামলার আগে তিনি এক অডিও বার্তায় এই অভিযানকে ‘আল আকসা ফ্লাড’ বলে অভিহিত করেন। তিনি সেখানে বলেন, আল আকসা মসজিদে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদেই এই অভিযান।
এনডিটিভি জানিয়েছে, ২০২১ সালের মে মাসে মুসলমানদের পবিত্র স্থান আল আকসা মসজিদে হামলা করে ইসরায়েলি বাহিনী। আর তার প্রতিশোধ হিসেবেই এই অভিযান। আল আকসা মসজিদে ইসরায়েলের হামলা, উপাসকদের মারধর, বয়স্ক ও যুবকদের মসজিদ থেকে টেনে বের করার ঘটনা ঘটে তখন।
এই ঘটনার দুই বছরেরও বেশি সময় পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সবথেকে বড় আঘাত করে হামাস। যা ইসরায়েলকে যুদ্ধ ঘোষণা এবং গাজায় প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে বাধ্য করে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ১৯শ’র বেশি মানুষ।

বেশ কয়েকবার ইসরায়েলের হত্যা চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া দেইফ খুব কমই কথা বলেন এবং জনসমক্ষে কখনও উপস্থিত হন না। তাই যখন হামাসের টিভি চ্যানেল ঘোষণা করে যে তিনি বক্তৃতা দিতে চলেছেন, তখন ফিলিস্তিনিরা বুঝতে পারে যে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটতে চলেছে।
দেইফ রেকর্ডিংয়ে বলেছেন, আজ আল আকসার ক্রোধ, আমাদের জনগণ ও জাতির ক্রোধ বিস্ফোরিত হচ্ছে। আমাদের মুজাহেদিন (যোদ্ধা), আজ আপনার দিন, এই অপরাধীদেরকে বোঝানোর যে- তাদের সময় শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, হামাস বারবার ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে তাদের অপরাধ বন্ধ করা, বন্দীদের মুক্তি দেওয়া, নির্যাতন বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনি জমির দখল বন্ধ করার জন্য ইসরায়েলকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু তারা তা শুনেনি।
তিনি বলেন, হামাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘দখলদারি অপরাধ’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসলেও ইসরায়েল বরাবরই উস্কানি বাড়িয়ে দিয়েছে। হামাস অতীতে ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দিতে মানবিক চুক্তি করতে বলেছিল, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। অবৈধ দখল, আন্তর্জাতিক নীরবতা, আন্তর্জাতিক আইন ও রেজুলিউশনের অস্বীকৃতি এবং আমেরিকান ও পশ্চিমা সমর্থনের আলোকে আমরা এসব বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ইসরায়েলের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, দেইফ হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল। হামাসের একটি সূত্র বলেছে, হামলার প্রস্তুতির সিদ্ধান্তটি যৌথভাবে গৃহীত হয়েছিল। হামাসের আল কাসাম ব্রিগেডের কমান্ডার দেইফ এবং হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার এই সিদ্ধান্ত নেন। তবে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন দেইফ।
সূত্রটি বলেছে, এই অভিযানের তথ্য শুধুমাত্র কয়েকজন হামাস নেতারই জানা ছিল। এমনকি ইসরায়েলের শত্রু এবং হামাসের জন্য অর্থ, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ইরান পর্যন্ত এই হামলার বিষয়ে জানত না। হামাসের বহিরাগত সম্পর্ক বিভাগের প্রধান আলি বারাকা বলেছেন, আমরা এই যুদ্ধের জন্য দুই বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছি।
দেইফ সম্পর্কে যা জানা গেছে
১৯৬৫ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পরে স্থাপিত খান ইউনিস শরণার্থী শিবিরে মোহাম্মদ মাসরি নামে জন্মগ্রহণ করেন দেইফ। ১৯৮৭ সালে ফিলিস্তিনি বিদ্রোহের সময় হামাসে যোগদানের পর মোহাম্মদ দেইফ নামে পরিচিত হন তিনি। তিনি ১৯৮৯ সালে একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং ১৬ মাস কারাবরণ করেছিলেন।

মোহাম্মদ দেইফ গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদন কমিটির প্রধান ছিলেন এবং মঞ্চে কমেডিতে অভিনয় করতেন।
দেইফ হামাসের নেতৃত্বের পর্যায়ে আসার পর গাজায় বিভিন্ন সুড়ঙ্গ তৈরি করেন এবং বোমা তৈরির দক্ষতা বৃদ্ধি করেন।
দেইফ ইসরায়েলের মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তির তালিকায় রয়েছেন। গত কয়েক দশকে যত ইসরায়েলি আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তার সবগুলোর পেছনে ছিলেন দেইফ। হামাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলের একটি হত্যাচেষ্টায় দেইফ তার এক চোখ হারান এবং পায়ে গুরুতর আঘাত পান। ২০১৪ সালে ইসরায়েলের বিমান হামলায় তার স্ত্রী, ৭ মাস বয়সী ছেলে ও ৩ বছর বয়সী মেয়ে নিহত হন।
তিনি স্মার্ট ফোনের মতো আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেন না।







