রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্তির পথে বলে তিনি মনে করছেন। শনিবার (৯ মে) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই মস্কোতে আয়োজিত সীমিত পরিসরের বিজয় দিবস প্যারেডে ইউক্রেনে জয়ের অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
পুতিন বলেন, আমার মনে হয় বিষয়টি শেষের দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইউরোপের জন্য নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনায় তিনি আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে তার পছন্দের আলোচনাসঙ্গী জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোডার।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিমাদের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক তীব্র সংকটে পড়ে। এটি ১৯৬২ সালের কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। তবে পুতিন বারবারই বলে আসছেন, মস্কোর ঘোষিত সব সামরিক লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
ক্রেমলিনে বক্তব্য দেওয়ার সময় যুদ্ধের কারণ হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোর গ্লোবালিস্ট নেতৃত্বকে দায়ী করেন পুতিন। তার অভিযোগ, ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের পর ন্যাটো পূর্বদিকে সম্প্রসারণ না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বলয়ে টানার চেষ্টা করা হয়।
পুতিনের এই মন্তব্য আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় স্মরণে পালিত ৯ মে’র জাতীয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজের পর। প্রতি বছর আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে যুদ্ধে নিহত প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ সোভিয়েত নাগরিককে স্মরণ করা হয়।
তবে এবারের প্যারেড ছিল অনেকটাই সীমিত। সাধারণত রেড স্কয়ারে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক ও বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবস্থা প্রদর্শন করা হলেও এবার ক্রেমলিনের দেয়ালের বিপরীতে বড় পর্দায় সামরিক সরঞ্জামের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।
ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর যুদ্ধ এখন চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনীর যুদ্ধকালীন সময়ের চেয়েও দীর্ঘ।
১৯৯৯ সালের শেষ দিন থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকা পুতিন এখন মস্কোতে যুদ্ধ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মুখে রয়েছেন। এ যুদ্ধে লাখো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং রাশিয়ার তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কও শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।
রাশিয়া এখনো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস অঞ্চলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। যদিও ইউক্রেনীয় বাহিনীকে কয়েকটি দুর্গনগরীর লাইনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তবুও রুশ অগ্রযাত্রা চলতি বছরে ধীর হয়ে গেছে। বর্তমানে ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সম্প্রতি উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তিন দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এতে মস্কো ও কিয়েভ উভয়ই সম্মতি জানায়। পাশাপাশি দুই দেশ এক হাজার যুদ্ধবন্দি বিনিময়েও রাজি হয়েছে।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমি চাই যুদ্ধ বন্ধ হোক। প্রাণহানির দিক থেকে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত। প্রতি মাসে ২৫ হাজার তরুণ সেনা মারা যাচ্ছে। এটা পাগলামি।
তিনি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানোর আশাও প্রকাশ করেন। তবে এখন পর্যন্ত মস্কো বা কিয়েভ কোনো পক্ষ থেকেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের খবর পাওয়া যায়নি।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা সম্প্রতি বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রাশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী কিনা জানতে চাইলে পুতিন বলেন, তার কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর শ্রোডার।
অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, ইউক্রেনে রাশিয়াকে পরাজিত করতেই হবে। তাদের অভিযোগ, পুতিন একজন যুদ্ধাপরাধী ও স্বৈরশাসক; ইউক্রেনে সফল হলে ভবিষ্যতে তিনি ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশেও হামলা চালাতে পারেন। যদিও রাশিয়া এসব অভিযোগকে অর্থহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া পুতিন পশ্চিমা দেশগুলোকে ‘যুদ্ধ উসকে দেওয়ার’ অভিযোগ করেন। তার দাবি, ইউক্রেনকে বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো সংঘাত দীর্ঘায়িত করছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে পুতিন বলেন, স্থায়ী শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরই কেবল বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।








