চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অভিনেত্রী নূতনের লাক্স বিজ্ঞাপনে প্রথম মডেল হওয়ার গল্প

সৌন্দর্য সাবান হিসেবে লাক্স-এর জুড়ি মেলা ভার। বলা হয় উন্নয়নশীল দেশের বাজার এখনও লিড করছে এই টয়লেট সাবান। বৈশ্বিক বাজারে নানান জাতের সাবান এলেও লাক্স এখনও আগের মতোই ভীষণ  সিগ্ধ ও সুরভিত। লাক্স’র নাম শুনলেই আমাদের নাকে সুগন্ধের আমেজ আসে। বলা হয় এটি বিশ্ব জুড়ে চিত্রতারকাদের সৌন্দর্য সাবান।

১৯২৫ সালে লিভার ব্রাদার্স লাক্স সোপ’র প্রবর্তন করে। বিশ্বব্যাপী এই সাবানের বিস্তৃতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা অনর্থক। বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে লাক্স এর খ্যাতি সর্বত্র। সেই ধারাবাহিকতায়বাংলাদেশে লাক্স সাবান এখনও ভীষণ আকর্ষণীয়, জনপ্রিয়। এদেশে লাক্সের প্রথম উৎপাদন শুরু হয় ১৯৬৩ সালে। সেই হিসেবে ৬০ বছর অতিক্রমের পথে এই সাবান। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও এই সাবানের চাহিদা, আকর্ষণ কোনো কিছুই কমেনি, বরং বেড়েছে। আর এই আকর্ষণ তৈরিতে ভিন্ন ভিন্ন ত্বকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের লাক্সও এসেছে বাজারে। তবে লাক্স সাবানের চাহিদা ধরে রাখতে সেলিব্রেটিদের অবদান অস্বীকারের জো নেই।

Reneta June

 

বিজ্ঞাপন

নতুন নতুন বৈচিত্র্যময় মোড়ক, আর প্রচারণার নতুনত্ব লাক্স সাবানের বাড়তি অহংকার বললে ভুল হবে না। লাক্স-এর বিজ্ঞাপন মানেই আলাদা আমেজ, আলাদা সৌরভ। মনে হয় যেনো বিজ্ঞাপনের সেলিব্রেটি মডেল সুরভি ছড়িয়ে চলেছেন। আমাদের দেশে লাক্স সাবানের বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েনন্দিত হয়েছেন অনেকেই। অভিনয়, নৃত্য, সঙ্গীতাঙ্গনের অনেক সেলিব্রেটিই মডেল হয়েছে, শুভেচ্ছা দূত হয়েছেন। তবে সত্তর, আশির দশকের জনপ্রিয় নায়িকা নূতন অনেকটা আগবাড়িয়েই একচিলতে গৌরব নিয়ে বলতে পারেন- তিনিই লাক্সের বিজ্ঞাপনের প্রথম মডেল। এই অনন্য ইতিহাসে তাঁর আগে আর কেউ নয়।

হ্যাঁ, এদেশে লাক্সের বিজ্ঞাপনের প্রথম মডেল জনপ্রিয় অভিনেত্রী নূতন। ভারত পেরিয়ে ১৯৮৩ সালে লাক্স এদেশে প্রথম টেলিভিশন কমার্শিয়াল (টিভিসি) তৈরি করে। তবে আমাদের এই উপমহাদেশে ল্যাক্স সাবানের সাথে বহু সেলিব্রেটির নাম জড়িত রয়েছে। যে সব সেলিব্রেটিরা এই সাবানকে ভোক্তাদের মাঝে আরও তীব্র আগ্রহ বাড়াতে উপস্থাপন করেছেন। ভারতীয় সিনেমার প্রথম যুগের সাহসী নায়িকা লীলা চিটনিস ছিলেন লাক্সের বিজ্ঞাপনের প্রথম মডেল। ১৯২৯ সালে এই বলিউড নায়িকা প্রথম মডেল হন। এরপর ভারতের মীনা কুমারী, সুচিত্রা সেন, সায়রা বানু, আশা পারেখ, শর্মিলী ঠাকুর, মালা সিনহা, হেমা মালিনী, মাধুরী দীক্ষিতসহ আরও অনেকে লাক্সের বিজ্ঞাপনে মডেল হন।

৮৩ সালে সেই সময়ের হার্টথ্রব নায়িকা নূতনকে নিয়ে প্রথম বাংলাদেশে লাক্সের বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করে বিজ্ঞাপণী সংস্থা ‘এশিয়াটিক’। এটি পরিচালনায় ছিলেন আলী যাকের এবং আসাদুজ্জামান নূর। বিজ্ঞাপনটি তৈরি চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন এমএ মোবিন। সত্তর দশকে চলচ্চিত্র তারকা কবরী, শাবানা, ববিতা, অলিভিয়ার ভীড়ে ভীষণ রকম উজ্জ্বল উপস্থিতি দিয়ে একখণ্ড হীরক হয়ে চলচ্চিত্র জগতে আসেন আকর্ষণীয়া চেহারার নূতন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত স্বাধীন দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি দ্রুতই সিনেমা দর্শকদের হৃদয়ে আসন তৈরি করে নেন। মাঝে অভিনয়ে খানিকটা বিরতি দিলেও এরপর নায়ক রাজ্জাকের ‘পাগলা রাজা’ ছবিতে পান্না বাঈ এবং ‘লাইলি মজনু’ চলচ্চিত্রে আঞ্জুমান চরিত্রে অভিনয় করে নায়িকা নূতন সত্যিই নতুন এক দীপ্তি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। রুপ-লাবণ্যে তিনি এতোটাই আলো ছড়ান যে লাক্সের বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে তাঁকেই নির্বাচিত করা হয়।

 

সেই পুরনো স্মৃতি মনে করে অভিনেত্রী নূতন বলেন, ‘লাক্সের বিজ্ঞাপনের আভিজাত্য ছিল অন্যরকম। এর মূল বক্তব্য ছিল এটি বিশ্ব জুড়ে চিত্রতারকাদের সৌন্দর্য সাবান। তখন দেশে কত তারকা। বাংলা সিনেমার নায়িকারা মানুষের কাছে ভীষণ ভীষণ জনপ্রিয়। কিন্তু আমাকেই বেছে নেওয়া হয়। নিঃসন্দেহে আমার ক্যারিয়ারে এটি ছিল একটি বড় সম্মান বা এচিভমেন্ট। আসলেইতো আমার আগে আর কেউ কিন্তু এদেশে লাক্সের মডেল হওয়ার সুযোগ পাননি। আমিই এ দেশে প্রথম।’ নূতন আরও স্মরণে খুব সম্ভবত ঐ সময়ে ভারতে জনপ্রিয় নায়িকা হেমা মালিনীকে দিয়ে লাক্সের নতুন বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়। এর অনেক আগে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনও লাক্সের মডেল হন।

অভিনেত্রী নূতন জানান তাঁকে নিয়ে নির্মিত বিজ্ঞাপনের শুটিং করা হয় রাজধানীর হোটেল শেরাটনে। প্রথমে তাঁকে স্ক্রিপ্ট সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়। শুটিং-এর আগে এমনটি বলা হয় তিনি সিনেমার শুটিং নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। এরপর তিনি ফিরে এসে গোলাপ বাগানে কাজ করছেন। লাক্স সাবান মেখে ফ্রেস হয়ে চনমনে মুডে ছবি আঁকছেন।

নায়িকা নূতন তখন ইন্দিরা রোডে থাকতেন। শুটিং এর দিন শাড়ি, গহনা নিয়ে আসেন হোটেল শেরাটনে। শুটিং-এর জন্য বেছে নেওয়া হয় একটি কক্ষ, হোটেলের ফুলবাগান আর লন। নিজেই পরিচালকদের ডিরেকশন অনুযায়ী সাজগোছ, মেক আপ নেন। টিভিসিতে দেখা যায় শেষ শটে তিনি ফ্রেস লুকে বলছেন, ‘আমার সৌন্দর্য চর্চায় আমি অত্যন্ত যত্নশীল। তাই আমি রোজ ব্যবহার করি  সিগ্ধ, সুরভিত ইন্টারন্যাশনাল লাক্স। লাক্স সত্যিই একটি অপূর্ব সাবান।’

লাক্সের টিভিসি দেখলে স্মৃতির অতলে ডুবে যান অভিনেত্রী নূতন। এই বিজ্ঞাপনটি তাঁর জীবনের এক অনন্য স্পন্দন, দারুণ অনুভূতি। এই বিজ্ঞাপনে মডেল হয়ে কত পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নূতন? না সেকথা তিনি আর বলতে চান না। শুধু বললেন, ‘ভালো পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম।’

সময় পেরিয়ে গেছে অনেক। তথ্য প্রযুক্তিতে এসেছে নানা মাত্রা ও পরিবর্তন। তবু নন্দনতত্ত্বের বিচারে লাক্সের বিজ্ঞাপনে চিত্রনায়িকা নূতন এখনও সত্যিই নতুন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)