সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমির তালিকায় শ্রীমঙ্গলেও রয়েছে বেশ ক’টি বধ্যভূমি! স্বাধীনতার পর শ্রীমঙ্গলে ৬টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়। এরমধ্যে রয়েছে, সিন্দুরখাঁন, ওয়াপদা গেষ্ট হাউজ মাঠ, সবুজবাগ, পূর্বাশা, ভাড়াউড়া চা বাগান ও সাধু বাবার বটগাছ তলা বধ্যভূমি।
দীর্ঘদিন অরক্ষিত ছিল সিন্দুরখান চা-বাগানের মাঝে বধ্যভূমিটি। এখানে গড়ে উঠেনি কোন স্মৃতিস্তম্ভ। এলাকাবাসী জানান, যুদ্ধের সময়ে শত শত নিরীহ মানুষদের হত্যা করে ফেলে রাখা হতো এই বধ্যভূমিতে। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতিময় এই বধ্যভূমিটি শ্রীমঙ্গল থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিন্দুরখান চা বাগানের ৫নং বস্তির বাঁশবাগান এলাকায়, প্রায় ৩ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠা এ বধ্যভূমিটি এখনও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে।
অপর বধ্যভূমিটি শ্রীমঙ্গল কলেজ রোডে ভাড়াউড়া চা বাগানের পাশে গড়ে উঠে ‘চা-শ্রমিকদের বধ্যভূমি’। এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরী করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের পহেলা মে কাজ দেবার কথা বলে প্রায় ৫৫ জন নিরীহ চা শ্রমিককে বাগান থেকে ডেকে এনে এ বধ্যভূমিতে সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই স্তম্ভটি ‘চা শ্রমিকদের ত্যাগের ইতিহাসের প্রতীক’।
প্রবীণ শিক্ষক-লেখক দীপেন্দ্র ভট্টাচার্যের লেখায় এই বধ্যভূমিতে চা–শ্রমিকদের নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, পাকিস্তানী বাহিনী শ্রীমঙ্গল দখল করে ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল। ওই দিন পাকিস্তান বিমানবাহিনী শ্রীমঙ্গলে শেলিং করে। ৩০ এপ্রিল বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টার দিকে পাকিস্তান বিমানবাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করে। ২৭ এপ্রিলের শেলিংয়ে শ্রীমঙ্গলের দু’জন নিহত ও একজন আহত হন। নিহত দু’জনের একজন গৌরাঙ্গ মল্লিক ও অপরজন বাসাবাড়িতে কাজ করা জনৈক এক নারী। ৩০ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলে আস্তানা করার পরদিন ১ মে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের তাণ্ডবলীলা শুরু করে। শহরের পার্শ্ববর্তী ভাড়াউড়া চা-বাগানে বহু চা-শ্রমিককে একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।
ভাড়াউড়া বধ্যভূমিতে শহীদ ফাগু হাজরার ছেলে বিজয় হাজরা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সেদিনের ঘটনার পর এখানে সব লাশ একত্র করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। সেদিনই আমরা চা–বাগান ছেড়ে পালিয়ে যাই। যুদ্ধের পর লোকজন এসে এখানে মাটি তুলে মাথার খুলি গণনা করে ও বধ্যভূমি চিহ্নিত করে গেছে।’ শ্রীমঙ্গলের অন্যতম ভাড়াউড়া বধ্যভূমিতে ১৯৯৭ সালে একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হয়, ‘বধ্যভূমি ৭১’ । মূলত, এখন এটি বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে সবার কাছে পরিচিত!

শহরের ওয়াপদা মাঠের কাছে অবস্থিত বধ্যভূমিটির কোন সীমানা প্রাচীর না থাকায় একই ভাবে বধ্যভূমির অনেক জায়গা ইতোমধ্যে বেহাত হওয়ার অভিযোগ আছে। সেখানে কোন স্মৃতিস্তম্ভ, সীমানা প্রাচীর কিংবা সাইনবোর্ড পর্যন্ত নেই! একই অবস্থা সবুজবাগের বধ্যভূমিতে। তাছাড়া, প্রতিটি বধ্যভূমির কতটুকু জায়গা রয়েছে সরকারিভাবে তারও কোন হিসেবও নেই। ফলে দিন দিন সীমানা হারাচ্ছে শহীদ স্মৃতিগুলো।
জানা গেছে, শহরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকার ৮ শহীদের স্মৃতিবিজরিত বধ্যভূমির জায়গায় রাস্তা-স্থাপনা তৈরী হয়েছে!
শ্রীমঙ্গল শহরের বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় গণকবর সাধু বাবার বটতলা বিজিবি ক্যাম্পের অধীনে এবং বুড়বুড়িয়া ছড়ার ভাঙ্গনে এ বধ্যভূমিটির অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে! একাত্তরের নারকীয় হত্যাকান্ডে সাধু বাবার বটতলার সেই নির্মম ইতিহাস এ প্রজন্ম জানতে পারছে না।
এ প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম. ইদ্রিস আলী বলেন, শ্রীমঙ্গলের বধ্যভূমিগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা জাতি হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস-ঐতিহ্য জানানোর জন্য এটা জরুরি ও আবশ্যক।







