কক্সবাজারের রামুতে স্বামী-স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা করেছে একদল দুর্বৃত্ত। স্থানীয়দের দাবি, প্রেমিকা অন্যত্র বিয়ে করায় এমন ঘটনা ঘটিয়েছে এলাকার চিহ্নিত একটি সন্ত্রাসী পরিবার।
মঙ্গলবার দিনগত রাত থেকে বুধবার (১৯ জুন) ভোরের কোন এক সময় উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের উপরের খিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, একই গ্রামের কামাল হোসেনের মেয়ে রুবি আক্তার (১৯) ও তার স্বামী চট্টগ্রামের রাউজানের নুর মোহাম্মদ (২৮)।
এলাকাবাসীর তথ্য মতে, বিয়ের আগে রুবির সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল পাশের চরপাড়া গ্রামের রশিদ আহমদের ছেলে রমজানের। কিন্তু রুবির পরিবার অত্যন্ত গরীব হওয়ায় এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি রমজানের পরিবার। প্রেমের সম্পর্কের কারণে রুবির বাবা-মাকে দু-দফা মারধর করে রমজানের পরিবার। শেষবার মারধর করে রুবিকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দিতে বলে নতুবা এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় রমজানের ভাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী দেলোয়ার। পরে এ নিয়ে এলাকায় একটি সালিশী বৈঠকও হয়। বৈঠক থেকে রুবিকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঘর জামাই রাখার শর্তে রাউজানের নুর মোহাম্মদের সাথে রুবির বিয়ে হয়। কিন্তু রুবির বিয়ে হলেও থামেনি রমজানের বখাটেপনা। প্রায় সময় রুবির স্বামীকে মারধর করতে তেড়ে যেত রমজান, তার ভাই ও তাদের সহযোগীরা।
এর আগে, আরও দুবার রুবির স্বামী নূরকে হত্যার চেষ্টা করে রমজান, তার ভাই আনোয়ার ও আরও কয়েকজন দুর্বৃত্ত। কিন্তু ওই দু’বার এলাকাবাসীর বাধার মুখে তাদের ফিরে যেতে হয়। অবশেষে মঙ্গলবার রাতে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে স্বামী-স্ত্রীকে দু’জনকেই জবাই করে হত্যা করে প্রেমিক রমজান, তার ভাই আনোয়ার, ভাড়াটে সন্ত্রাসী মামুনসহ আরও কয়েকজন দুর্বৃত্ত।
বিষয়টি আঁচ করতে পেরে এলাকাবাসী ধাওয়া করে রমজানের ভাই আনোয়ার ও মামুনকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। কিন্তু স্থানীয় চেয়ারম্যানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত রমজানের ভাই দেলোয়ার ও বজল ডাকাত পুলিশকে গুলি করে আনোয়ারকে ছিনিয়ে নেয়। পরে লোক মারফত পুলিশের হ্যান্ডকাফ ফেরত পাঠায়।
নিহত রুবির মা আমিনা খাতুন বলেন, বিয়ের আগেও আমার মেয়েকে উত্যক্ত করত রমজান। প্রায় সময় আমার বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করত রমজান। বিষয়টি তার পরিবারকে জানালে ছেলেকে শাসন না করে উল্টো আমাদেরকে মারধর করে রমজানের বাবা-মা। পরে স্থানীয়ভাবে সালিশী ডাকার অপরাধে রমজানের ভাই দেলোয়ার আরেক দফা আমাকে ও আমার স্বামীকে মারধর করে মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দিতে বলে নতুবা এলাকা ছাড়ার হুমকি দেন। এরপর মাস তিনেক আগে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেই। ভেবেছিলাম এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হলো উল্টো। রুবির বিয়ের পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে রমজান।
নিহতের মা আরও বলেন, গত মঙ্গলবার রাত থেকে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয় আমাদের এখানে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রমজান, তার ভাই আনোয়ার, ভারুয়াখালির মামুনসহ আরও কয়েকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমার মেয়ের কক্ষে প্রবেশ করে। এরপর তারা আমার মেয়েকে ধর্ষণ করে। পরে দু’জনকে জবাই করে হত্যা করে। পরে ভোররাতে বিষয়টি আমরা আঁচ করতে পারলে এলাকাবাসীর সহযোগীতায় রমজানের ভাই আনোয়ার ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী মামুনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করি। কিন্তু পুলিশকে গুলি করে আনোয়ারকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কাশেম টুলু বলেন, রুবিদের পরিবার অত্যন্ত গরীব। রমজানের হাত থেকে মেয়েকে রক্ষা করতে আরেক গরীব ছেলেকে ঘরজামাই রেখে বিয়ে দেয়। কিন্তু রমজান ও তার পরিবার তাদেরকে বাঁচতে দিল না।
তিনি আরও বলেন, রমজানের ভাই দেলোয়ার মাস ছয়েক আগে শহীদ নামের একজনকে খুন করে। ওই ঘটনার সাথে এবারের ঘটনায় জড়িত থাকা মামুন যুক্ত ছিল। তখন তার নাম বলেছিল তারেক। রমজানের পরিবারের সাথে অনেক ভাড়াটে সন্ত্রাসী রয়েছে।
ঈদগড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফিরোজ ভুট্টো বলেন, রমজান রুবিকে ভালবাসতো। কিন্তু রমজানের পরিবার বিষয়টি মেনে না নিয়ে রুবির বাবা মাকে দু’দফা মারধর করে। পরে এলাকাবাসীর পরামর্শে রুবিকে অন্যত্র বিয়ে দেয়া হয়। এরপরও রুবির স্বামী ও রুবির বাবা মাকে হুমকি দিতো রমজান। কয়েকদিন আগে এমন হুমকি দিলে ইউনিয়ন পরিষদ রুবির পরিবারকে আইনি সহযোগীতা নেওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। শুনেছি তারা আইনের আশ্রয়ও নিয়েছিল। কিন্তু গতরাতে স্বামী-স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা করেছে রমজান ও তার সহযোগীরা।
আসামী ছিনিয়ে নেওয়া বজল ডাকাত ও রমজানের ভাই দেলোয়ার তার অনুসারী কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, ঘটনাস্থলে বজল ছিলেন না। তবে দেলোয়ারের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। উল্টো বেশ কয়েকমাস আগে শহীদ হত্যা মামলায় দেলোয়ারকে ধরে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় আমি সোপার্দ করেছিলাম। এই কারণে দেলোয়ার পরিবার আড়ালে আমাকেও হুমকি দিত।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু তাহের দেওয়ান বলেন, ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে আমরা একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছি। এছাড়া আসামী ছিনিয়ে নেওয়ার মত কোন ঘটনা ঘটেনি। লোকজনের সব কথা সব সময় ঠিক নয়। নিহতদের মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রয়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহাফুজুল ইসলাম বলেন, প্রেমিকার অন্যত্র বিয়ে হওয়ায় প্রতিশোধ পরায়ণ প্রেমিক দু’জনকে খুন করেছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কারা কারা এর সাথে জড়িত জানতে। আসামী ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আমি খোঁজ-খবর নিচ্ছি।







