দীর্ঘ ১৬ বছর পর বাংলাদেশে ফিরছে ‘না’ ভোটের বিধান। তবে এই বিধান সব আসনের জন্য প্রযোজ্য হবে না। এবার কেবল কোনো আসনে একজন প্রার্থী থাকলে, তাকে বিনা ভোটে নির্বাচিত করা হবে না। তার বিপক্ষে ব্যালটে থাকবে ‘না’ ভোটের বিধান।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংস্কারের একগুচ্ছ সুপারিশ চূড়ান্ত করতে মুলতবি বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন চাইলে ৩০০ আসনের ফলাফল বাতিল করার ক্ষমতা পাবে।
তিনি বলেন, ”সার্বিকভাবে ‘না’ ভোট নয়। যদি কোনো আসনে একজন প্রার্থীও হয় তাকেও নির্বাচনে যেতে হবে, তাকে ‘না প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। সেখানে ‘না’ ভোট হেরে গেলে, তাহলে আর ভোট হবে না। তখন ব্যক্তি, প্রার্থী নির্বাচিত হবে।”
২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘না’ ভোটের বিধান ছিল সব আসনে। পরে দশম সংসদে তা বাদ দেওয়া হয়। এবার ‘না’ ভোটের বিধান চালুর প্রস্তাব ছিল সংস্কার কমিশনের।
তবে ইসি সব আসনে ‘না’ ভোটের বিধান চালু না করলেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা রোধে শুধু একক প্রার্থী থাকলে তাকে ‘না’ ভোটের সঙ্গে লড়তে হবে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা রোধে এ ব্যবস্থা করেছে ইসি।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রথম যাত্রা ২০০৮-এ
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে ভোটাররা প্রথমবারের মতো ‘না ভোট’ প্রয়োগ করেছিল। ওই সময় জারি করা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ধারা ৩১(৫)(বিবি)-তে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ বিধান অনুযায়ী ব্যালট পেপারের সবশেষ প্রার্থীর স্থানে লেখা থাকে ‘ওপরের কাউকে নয়’ এবং ভোটারদের সহজ পরিচিতির জন্য মার্কা রাখা হয় ‘ক্রস’ (ঢ)। তখন সারা দেশে মোট প্রদত্ত ৬ কোটি ৯৭ লাখ ৫৯ হাজার ২১০ ভোটের মধ্যে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৪৩৭টি ‘না ভোট’ পড়েছিল।
ওই নির্বাচনে ৩৮টি দল অংশগ্রহণ করলেও মাত্র ৬টি দল ‘না ভোটের’ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল। এর অর্থ হচ্ছে ‘না ভোট’ সপ্তম স্থানে ছিল। এ বিধান নিয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকরা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই পরবর্তী সময়ে সরকার এ ধারাটি বাদ দেয়।
২০০৮ ও ২০২৬ সালের ‘না’ ভোটের পার্থক্য
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘না’ ভোটের সুযোগ আর রাখা হয়নি।
২০১৪ সালের বিতর্কিত দশম সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী বিজয়ী হন। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল নির্বাচন বর্জন করেছিল। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ১২৭টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায়।
নবম নির্বাচনের অভিজ্ঞতা
২০০৮ সালের নির্বাচনে পার্বত্য রাঙ্গামাটিতে ‘না’ ভোটের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯.৬৬ শতাংশ (৩২ হাজারের বেশি ভোট)। এক শতাংশের বেশি ‘না’ ভোট পাওয়া অন্যান্য আসনের মধ্যে রয়েছে রংপুর-৩ (১.২০%), যশোর-৩ (১.০৩%), খুলনা-২ (১.১০%), ঢাকা-৮ (২.৪৪%), ঢাকা-১২ (২.১৩%), ঢাকা-১৩ (৩.০২%), ঢাকা-১৪ (২.৪০%), ঢাকা-১৭ (২.৬৩%) ইত্যাদি।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ‘না’ ভোটের বিধান আর রাখা হয়নি। এবার একক প্রার্থী থাকা আসনে তা ফেরানো হচ্ছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, যদি ‘না’ ভোট তখন বাতিল করা না হতো, তাহলে হয়তো এত বিশাল সংখ্যক আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিততে পারতেন না। নির্বাচনে কিছু মানুষ কেন্দ্রে যেত।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘না’ ভোট কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর একটি মাধ্যম। এটি ফিরলে প্রার্থী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো আরও সতর্ক হবে এবং ভোটারদের আস্থাও বাড়তে পারে।







