আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের জন্য চূড়ান্ত বিচার দিবস নির্ধারণ করেছেন, যেদিন প্রত্যেককে তাদের কর্মের হিসাব দিতে হবে। তবে আল্লাহর এক মহান রহমত হলো—তিনি তার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষ এক মর্যাদা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি উম্মতের জন্য শাফায়াত (সুপারিশ )করবেন। এই শাফায়াতের মাধ্যমে বহু মানুষ আল্লাহর রহমতে নাজাত পাবে।
“শাফায়াত” শব্দটি আরবি, যার অর্থ হলো সুপারিশ বা মধ্যস্থতা করা। কিয়ামতের দিন যখন মানুষের পাপের বোঝা ভারী হবে, বিচারের ভয়াবহতায় তারা আতঙ্কিত হবে, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর অনুমতিতে উম্মতের জন্য শাফায়াত করবেন।
কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তারা (শাফায়াতকারীরা) কেবল তাদের পক্ষেই সুপারিশ করবেন যাদের জন্য দয়াময় আল্লাহ অনুমতি দেবেন।” (সূরা আম্বিয়া: ২৮)
এছাড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“আমাকে পাঁচটি বিশেষত্ব প্রদান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে কাউকে দেওয়া হয়নি, তম্মধ্যে একটি হলো, শাফায়াত।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪২১)
শাফায়াতের প্রকারভেদ:
শাফায়াত প্রধানত দুই প্রকার-
১. বিশেষ শাফায়াত
এটি একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্দিষ্ট। কিয়ামতের কঠিন মুহূর্তে সমস্ত নবী, ফেরেশতা ও নেককাররা সুপারিশের ক্ষমতা না থাকায় মানুষ হতাশ হয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসবে। তিনি আল্লাহর অনুমতিতে সুপারিশ করবেন, যাতে বিচার দ্রুত শুরু হয়। এটিই “মাকামে মাহমুদ” নামে পরিচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “সম্ভবত আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাকামে মাহমুদে (প্রশংসিত অবস্থানে) পৌঁছে দেবেন।” (সূরা বনী ইসরাইল: ৭৯)
২. সাধারণ শাফায়াত
এটি অন্যান্য নবী, নেককার বান্দা ও শহীদদের জন্য প্রযোজ্য, তবে সর্বোচ্চ শাফায়াত হবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে। সাধারণ শাফায়াতের কয়েকটি ধরন হলো-
ক. গুনাহগার মুমিনদের মুক্তির জন্য:
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার শাফায়াত আমার উম্মতের বড় বড় গুনাহগারদের জন্য সংরক্ষিত।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৩৯)
খ. জান্নাতের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য:
কিছু মুমিন যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে শাফায়াত করা হবে।
গ. শিশুদের জন্য শাফায়াত:
নাবালক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা শিশুদের জন্য তাদের পিতা-মাতার পক্ষে সুপারিশ করা হবে। (তিরমিজি, হাদিস: ১০৭১)
কে শাফায়াত পাবে?
যারা শাফায়াত পাওয়ার উপযুক্ত, তাদের জন্য কিছু শর্ত রয়েছে—
১. শুধুমাত্র মুমিনরা শাফায়াত পাবে:
কুরআনে বলা হয়েছে— “যারা সত্যের সাক্ষ্য দেয় এবং জ্ঞানের সঙ্গে তা গ্রহণ করে, তাদের জন্য শাফায়াত রয়েছে।” (সূরা যুখরুফ: ৮৬)
২. তাওহিদের ওপর মৃত্যু বরণ কারী:
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহকে উপাস্য বলে সাক্ষ্য দিল এবং এ বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬)
৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা রাখা:
তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসে, সে কিয়ামতের দিন আমার সঙ্গে থাকবে।” (তিরমিজি, হাদিস: ২৬৮৬)
৪. দরুদ শরিফ পাঠ কারী:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন।” (মুসলিম: ৪০৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত এক অসীম রহমত, যা কিয়ামতের দিন অনেক গুনাহগার মুমিনদের মুক্তির জন্য আল্লাহর অনুমতিতে কার্যকর হবে। আমাদের উচিত তার সুন্নাহ মেনে চলা, বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা ও তাওহিদে এবং রিসালতে অবিচল থাকা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত লাভের সৌভাগ্য দান করুন।
আমিন বিজাহিন নাবিয়্যিল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!







