অখণ্ড ভারতবর্ষে ২০০ বছরের গোলামির শৃঙ্খল পরে আরব সাগরের তীরে ভিড়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লাল ফৌজের ব্রিটিশ বেনিয়ারা। ব্যবসায়ী বণিকেরা বিকিকিনির অজুহাতে প্রবেশ করে পুরো ভারতবর্ষকে সাম্রাজ্যবাদের নখরে গিলে নিয়েছিল-রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামো।
বিশ্বের দেশে দেশে উপনেবিশিক প্রভুদের তৎপরতা ছড়িয়েছিল এই বাণিজ্যিক প্রভু বণিকদের হাত ধরেই। একালের কাবলিওয়ালারা নিজ দেশের দোসরদের মাধ্যমেই সেই সাম্রাজ্যবাদের প্রসার ঘটিয়ে চলেছে দেশে দেশে। আক্রান্ত সেই দেশ ও আমজনতার ভাগ্যে নেমে আসবে পরাধীনতার বিষময় বাস্তবতা। ব্যবসার ভূমির স্বত্ব ও মালিকানা হারিয়ে নিঃশেষ কালো আঁধারে নিমজ্জিত হবে জনমানুষের ভাগ্য। যদিও একটি অংশের মানুষের মগজে ব্যবহৃত মরফিনের ঘোর কেটে গেলে নিজেরাই নিজেদের পশ্চাৎদেশে থাবা বসাবে। এর আগেই যদি মোহ কেটে সচেতন হওয়া যায়, তবে হয়তো মুক্তির দেখা মিলবে। তাই বলি, দেশ মানে মানবের মা, মাটি, আর জন্ম-মৃত্যুর ঠিকানা।
আমার গভীর বিশ্বাস—মানুষ হিসেবে সব ভালো একজন ব্যক্তি কেন্দ্রিক হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়। জীবনের গভীর জলতরঙ্গে নিরবে-নিভৃতে বইছে জগৎ-সংসারের সকলের সম্মিলিত কল্যাণ। সুখ, আনন্দ আর বৈষম্যহীন সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং হালের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা থাকা জরুরি। তবে সেই চিন্তার স্বাধীনতা যেন সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্য কোনও জনগোষ্ঠীর মত ও মতাদর্শে ন্যূনতম আঘাত না করে। জীবনের গভীর এমন সব মর্মার্থ ভুলে পুরো জগৎ সংসার একলা ভোগ-বিলাসের জীবনে মেতেছে—সেখান থেকেই শুরু হয়েছে দেশে দেশে, রাষ্ট্রে সমাজে সকল অস্থিরতা।
এই ভোগী-বিলাসী লিপ্সু একক ব্যক্তি-কেন্দ্রিক জীবনের লাগাম টেনে ধরা উচিত। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দখলে থাকা মৌলিক নীতির সকল সূচক যদি জনমানুষের জন্য নিশ্চিত করা যায়, তবে রাষ্ট্রে ও বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা কমবে। কিন্তু ব্যক্তির ভোগী লিপ্সার কারণে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঁধে আজ যে যুদ্ধের বোঝা চেপে বসেছে, সেই জগদ্দল পাথরের চাপা মানবিকতাকে উদ্ধার করার দায়ও ব্যক্তি ও গোষ্ঠীরই।
এই ধারায় একজন নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, চে গেভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, মুজিবের মতো নেতৃত্বের প্রয়োজন। অদ্ভুত হলেও সত্য—গত অর্ধ শতকে তাঁদের মতো মানবতাকামী, জনমানুষের মুক্তির জননায়ক পুরো বিশ্বেই খুব বেশি আসেননি। বলা চলে, দেশে দেশে উদার, জীবনের গভীর অর্থ বোঝা, জনমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা, চিন্তাশীল নেতার জন্মই হয়নি। চলতি শতাব্দীতে বিশ্বের দেশে জন্ম হয়েছে ধনিক শ্রেণির মেধাবী এক একজন আইকন—বিল গেটস, জ্যাক মা, স্টিভ জবস, মার্ক জুকারবার্গদের মতো।
এদের কল্যাণে বিশ্বে প্রযুক্তির সুপার পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটেছে। এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা), মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন, ইন্টারনেট অব থিংস, ডেটা সায়েন্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি—এসব প্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসার ঘটেছে। যা মানুষের জীবন, জীবিকা ও চিন্তার ধরন পাল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানের জয় হয়েছে, গতি পেয়েছে প্রগতি। তবে মানুষের আবেগ, আনন্দ ও জীবনবোধে এমন ধাক্কা লেগেছে যে মানুষ তার সহজাত বুদ্ধিবৃত্তিক মানবিক সত্তাকে প্রায় হারাতে বসেছে! তা না হলে যেই ইলন মাস্ক অমরত্বের পেছনে বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গবেষণা করছেন, তিনি কেন জীবন্ত মানুষের কদর বুঝতে চান না? কেন আজ বিশ্বের বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর আয়ের অন্যতম উৎস ‘মানুষ মারার মারণাস্ত্র’?
এই দ্বিচারিতা! একদিকে অমরত্বের খোঁজে বিপুল বিনিয়োগ, আর আরেকদিকে সৃষ্টির সেরা জীবকে ধ্বংসের জন্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ—ভাবা যায়?
গত এক শতাব্দীতে মানবিক জীবন ও জগৎ সংসারের বুনিয়াদি প্রেমের ঘোরে কোনও নেতা, প্রযুক্তিবিদ কিংবা রাষ্ট্রনায়কের জন্ম হয়নি। বরং নিছক ব্যবসায়িক চিন্তাধারায় বিশ্ব ধনভাণ্ডারের রথী-মহারথিরাই হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রনায়ক। তারা হামলে পড়ে লুটে নেওয়ার নতুন কৌশলে উপনিবেশিক প্রভুদের মতো দেশে দেশে তৎপর।
তারা মূলত তিনটি পদ্ধতিতে তাদের অস্ত্রের বাজার নিশ্চিত করছে—
- প্রথমত, যুদ্ধের উসকানি দিয়ে নিজেরা অস্ত্র বিক্রির লাভ নিচ্ছে।
- দ্বিতীয়ত, পররাষ্ট্র নীতির অভিজাত কৌশলে বিশ্বজুড়ে দেশগুলোকে অস্ত্র কেনায় প্ররোচিত করছে।
- তৃতীয়ত, ডিপ স্টেটের তত্ত্বের ঝোলায় সরকার উৎখাতের নতুন ফর্মুলা নিয়ে দেশে দেশে ঘুরছে।
সাম্রাজ্যবাদের একালের কাবলিওয়ালারা মেতেছে এক ঘৃণ্য, নীতি-নৈতিকতাহীন, স্বাধীন দেশের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপের নীতিতে। সীমিত সম্পদ আর বিপুল জনগণের রাষ্ট্রগুলোতে উসকে দিচ্ছে আবেগ, গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছে অথচ বিভাজনের নোংরা খেলায় মত্ত। ‘সোসাইটি কাক’দের ভাত ছড়িয়ে ডেকে এনে রাষ্ট্রের ভিত ভাঙছে। মানুষে মানুষে বিভাজন বাড়িয়ে গোলা পানিতে মাছ শিকার করছে তারা।
স্থানীয় ব্যবসা ও শিল্পের পঙ্গু দশা আর বিদেশি বেনিয়ার লুটপাটের ফলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি নড়বড়ে। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, ১৯৭১ সালে যেভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছে, সেভাবে এখন দেশের ব্যবসায়ীদের হত্যা করা হচ্ছে। শিল্পে গ্যাস নেই, একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, উপদেষ্টারা যেন উটপাখির মতো বালুর মধ্যে মাথা গুঁজে আছেন!
সাধারণ মানুষ এখনো বিভক্ত। একদল মনে করে এবারই ক্ষমতায় যাওয়ার উপযুক্ত সময়, আরেকদল ভাবছে তারা এতদিন বঞ্চিত ছিল, এবার সুযোগ তাদের। আজকের অনেক বুদ্ধিজীবী, লেখক, আমলা, বিচারপতি, সাংবাদিক—নানান মুখোশ পরে জর্জ সোরোসের হাতের পুতুল হয়ে উঠেছে। কারও কারও আশ্রয় উন্নত দেশে যাওয়ার বাসনা, কারও নিছক সুবিধা বা অর্থলোভ। তারা নিজেরাই নিজেদের কবর খুঁড়ছে।
কিন্তু এই মস্তিষ্কের মরফিনের নেশা একদিন শেষ হবে। যেদিন এই নেশা কেটে যাবে, সেদিন মনের বাঘে খাওয়া শুরু হবে-
বনের বাঘ লাগবে না। এই নজির ইতোমধ্যে দেখা গেছে সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরানসহ বহু দেশে। তাই সময় থাকতে ফিরে চলুন নিজের মাটি ও মানবিকতা-বোঝা জগৎ সংসারে। দাঁতের মর্যাদা বোঝার মতো আত্মসচেতনতা জাগুক সবার মধ্যে-এটাই প্রত্যাশা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








