চলমান যুদ্ধ ভবিষ্যতের মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মনোভাব ও অবস্থানকে প্রভাবিত করবে উল্লেখ করে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জ্যাক লিউ তার বিদায়ী সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইসরায়েলে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা কৌশলগত সুবিধার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে সক্ষম। এ বিষয়টি উপেক্ষা করা হলে তা ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
জ্যাক লিউ বলেন, ইসরায়েল বহুবার ব্যক্তিগত ছোট মতপার্থক্যগুলোকে বড় করে দেখিয়ে তা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে, যার নেতিবাচক কৌশলগত প্রভাব পড়েছে।
জ্যাক লিউ ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের আক্রমণের পরপরই ইসরায়েলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার মেয়াদকালজুড়ে ইসরায়েল ও বাইডেন প্রশাসনের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে টানাপোড়েন লক্ষ্য করা গেছে।
লিউ উদাহরণ হিসেবে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাব অনুমোদনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা এবং রাফাহ শহরে সামরিক অভিযানের বিষয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার ঘটনাগুলো উল্লেখ করেন।
লিউ গাজায় চলমান মানবিক সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েলের ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, আমরা বহুবার ইসরায়েলকে অনুরোধ করেছি দ্রুত তথ্য সরবরাহ করতে, কারণ দেরি হলে ভুল তথ্য প্রচার হতে পারে।
তার মতে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যথেষ্ট মানবতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে, যা তাদের বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা। তিনি বলেন, ইসরায়েলের উচিত তাদের অবস্থান আরও মানবিকভাবে তুলে ধরা, যা আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতে সহায়ক হবে।
লিউ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, বর্তমানে আমেরিকায় জনমত এখনো ইসরায়েলপন্থী হলেও ভবিষ্যতের প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারক হবে, তাদের অভিজ্ঞতা এই যুদ্ধ থেকেই তৈরি হবে।
তিনি বলেন, জো বাইডেন এমন একজন নেতা, যিনি তার প্রজন্মের শেষ প্রতিনিধি, যার ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে। ভবিষ্যতের নেতাদের জন্য এই সমর্থন নিশ্চিত করতে ইসরায়েলকে এখনই কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে।
লিউ মনে করেন গাজার ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সম্পৃক্ত করা না হলে ইসরায়েলকেই গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের নেতৃত্ব যদি রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে পারে, তাহলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য ইসরায়েলকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই কথাগুলো এমন সময় উঠে এসেছে যখন প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইসরায়েলের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করতে চেষ্টা করছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় দোহায় এই আলোচনা চলছে। ইসরায়েলের মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এবং বাইডেনের শীর্ষ উপদেষ্টা ব্রেট ম্যাকগার্ক আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। তবে হামাস পুরোপুরি ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ছাড়া কোনো চুক্তিতে যেতে রাজি নয়।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু আংশিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন।
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৫০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৯ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া ৯০ শতাংশ মানুষ তাদের বাড়িঘর হারিয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্যকর্মীরা জানায়, গত ১০০ দিনে প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
জাতিসংঘের একাধিক বিশেষজ্ঞ এই পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ বলেছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও গাজায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জ্যাক লিউ তার সাক্ষাৎকারে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক সহযোগিতার প্রশংসা করেন এবং বলেন, যুদ্ধের সময় আমাদের সহযোগিতা প্রমাণ করেছে যে, আমরা একসঙ্গে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারি।
লিউর এই বিদায়ী বার্তা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।








