যেসব পরিবার নিজ দেশ ছেড়ে অন্য কোনও দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের চিন্তা করছেন তাদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়-কোন দেশটি তার সন্তানকে লালন পালনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হবে? তাদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও বসবাসযোগ্য দেশগুলোর র্যাঙ্কিং সহায়ক হতে পারে। তবে এই র্যাঙ্কিং দেশগুলোর গড় আয় বা আর্থিক স্থিতিশীলতা ভিত্তিতে করা হয়নি, বরং গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শিশুদের স্বাস্থ্য, মানসিক প্রশান্তি, শিক্ষার গুণগত মান, পারিবারিক ছুটির নীতির ওপর।
সোমবার (২৮ অক্টোবর) বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিসেফ এই বিষয়গুলো দেখে শিশুর সুস্থতার একটি রিপোর্ট তৈরি করেছে। এই তালিকার প্রতিটি দেশই ধনী। তবে প্রবাসী সব পরিবার এই নিবন্ধের ব্যাপারে সমানভাবে আগ্রহী নাও হতে পারে।
জাপান
শিশুদের সুস্থতার বিষয়ে ইউনিসেফের ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জাপান প্রথম স্থানে রয়েছে। দেশটি মূলত শিশু মৃত্যু ঠেকানো এবং জীবনের প্রথম দিকে স্থূলতা প্রতিরোধ করার দিকে নজর দেয়। ইউনিসেফের ২০২২ সালের রিপোর্ট কার্ডে পরিবেশের দিক থেকে জাপান দ্বিতীয় স্থানে ছিল। এর মধ্যে শহরগুলোয় বনায়ন এবং ট্রাফিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। জাপানে শৈশবে স্থূলতার হার সবচেয়ে কম। এর পাশাপাশি, শিশুমৃত্যুর হার কম, বায়ু ও পানি দূষণের মাত্রাও (যা শিশুদের প্রভাবিত করে) কম। এটি যেকোন পরিবারের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়।

এখানে ট্র্যাফিক দুর্ঘটনা যেমন কম ঘটে, তেমনি যেকোনও দেশের তুলনায় জাপানে খুনের হার সবচেয়ে কম, প্রতি লাখে মাত্র দশমিক দুই জন মানুষ। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার পাঁচ দশমিক তিন শতাংশ, কানাডায় এক দশমিক আট শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় দশমিক আট শতাংশ। শিশুরা টোকিওর চারপাশে হাঁটতে পারে এবং নিজে নিজে স্কুলে যেতে পারে। এটি ওই দেশে স্বাভাবিক কারণ সেখানকার পরিবেশ খুবই নিরাপদ। বাচ্চাদের নিয়ে কেউ তেমন দুশ্চিন্তা করে না, কারণ এর প্রয়োজন নেই।
স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা ছাড়াও, জাপানে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ইউনিসেফের উন্নয়ন সহযোগী ওইসিডি’র তথ্য অনুসারে, এর শিক্ষা ব্যবস্থা ৭৬টি দেশ এবং অঞ্চলগুলির মধ্যে ১২তম স্থানে রয়েছে। যেসব বাবা মায়েরা কাজ করেন, কোম্পানিগুলো তাদের পেইড প্যারেন্টাল লিভ বা বেতনভুক্ত ছুটি দিয়ে থাকে। কর্মজীবী পিতামাতা ১২ মাসের মধ্যে যে কোনও সময় এই ছুটি নিতে পারেন এবং এই ছুটি কাটানোর জন্য তাদের কোনও বেতন কাটা হয় না। দেশটিতে পুরুষদের ছুটির বিষয়ে আরও ছাড় দেয়ার কাজ চলছে।
এস্তোনিয়া
সম্ভবত এস্তোনিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এখানকার শিশুদের গণিত, বিজ্ঞান এবং ভাষাগত দক্ষতা এশিয়ার বাইরের অন্য যেকোনও দেশের তুলনায় বেশি। এখানে ডিজিটাল দক্ষতার ওপরও জোর দেয়া হয়। এই পদ্ধতিতে শেখা রোবোটিক্স পড়ার চাইতেও উপকারী। সাম্প্রতিক ওইসিডি রিপোর্টে দেখা গেছে যে, এস্তোনিয়ায় গড়ে পাঁচ বছর বয়সী শিশু যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের তুলনায় সামাজিক-মানসিক দক্ষতায় ভালো পারফরম্যান্স করেছে। তারা যেমন অন্যান্য শিশুদের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে পারে, পাশাপাশি আবেগ অনুভূতিও বুঝতে পারে। এই শিশুদের নিজেদের উপর ফোকাস করার ক্ষমতা, নানাভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, ওইসিডি গড় স্কোরের চেয়ে বেশি।

যেসব দেশে ‘পারিবারিক ছুটি’ দেয়া হয়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উদার নীতির দেশগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এস্তোনিয়া। নারীরা ১০০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি পেতে পারেন এবং পুরুষরা ৩০ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটি পেতে পারেন। পরে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা বেতনসহ আরও ৪৭৫ দিনের ছুটি পেতে পারেন। এই ছুটি বাবা মায়েদের নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া বা নিজের সুবিধা বুঝে খণ্ডকালীন ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। শিশুর বয়স তিন বছর না হওয়া পর্যন্ত এই ছুটি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ৬০ দিন পর্যন্ত বাবা-মা দুজনই বাড়িতে থাকতে পারেন এবং কোম্পানির কাছ থেকে টাকা পেতে পারেন।
সন্তান ১৪ বছর না হওয়া পর্যন্ত বাবা-মা দুজনই ১০টি অতিরিক্ত ছুটি পান। (এই ছুটিগুলি বিদেশিসহ এস্তোনিয়ার অস্থায়ী এবং স্থায়ী দুই ধরনের বাসিন্দারাই পাবেন)।
স্পেন
বিশেষ করে কম শিশুমৃত্যুর হার এবং কম বায়ু ও পানি দূষণের কারণে শিশুদের অসুস্থতার হার অনেক কম হওয়ায় চারপাশের পরিবেশের জন্য স্পেনকে ইউনিসেফের র্যাঙ্কিংয়ে সর্বোচ্চ রেট দেওয়া হয়েছে। ইউনিসেফের মতে, সামাজিক, শিক্ষাগত এবং স্বাস্থ্য পরিষেবায় সামগ্রিকভাবে কম পারফরম্যান্স সত্ত্বেও, স্পেনের শিশুদের সুস্থতার হার অনেক বেশি।শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে দেশটি তৃতীয় এবং মৌলিক সাক্ষরতা ও সামাজিক দক্ষতায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে।এখানকার শিশুদের কাছে যখন জানতে চাওয়া হয় যে তাদের পক্ষে বন্ধুত্ব করা সহজ কি না, ৮১ শতাংশ উত্তর দেয়- হ্যাঁ। এই স্কোর নেদারল্যান্ডসের সমান।
প্যারেন্টাল লিভ বা ছুটির জন্য, মা ও বাবা দু’জন এমনকি তারা ফ্রিল্যান্সার হলেও শতভাগ বেতনসহ ১৬ সপ্তাহ ছুটি পান।প্রত্যেক মা তিন বছরের আনপেইড লিভ বা অবৈতনিক ছুটি নিতে পারেন বা তারা তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনতে পারেন।স্পেনের যেসব বাসিন্দাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার (সোশ্যাল সিকিউরিটি) নিবন্ধন আছেন তারা সবাই এই সুবিধা পেতে পারেন, তবে শর্ত থাকে যে তারা গত সাত বছরে কমপক্ষে ১৮০ দিনের বকেয়া পরিশোধ করেছেন।

তবে অন্যান্য দেশের মতো এখানেও কিছু অপূর্ণতা রয়েছে। যেমন, দেশটিতে পর্যাপ্ত ডে কেয়ার সেন্টার বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নেই। এখানকার ৩৩ শতাংশ বাবা মা জানিয়েছেন যে এখানে পর্যাপ্ত হারে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকলে ভালো হতো।বাবা-মায়ের এমন ভাবনার হার অন্যান্য ধনী দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি হলেও এটা স্পষ্ট যে স্পেন শিশুদের লালন পালনের জন্য সেরা দেশগুলির মধ্যে একটি।
ফিনল্যান্ড
ইউনিসেফের র্যাঙ্কিংয়ে ফিনল্যান্ডের অবস্থান পঞ্চম। দেশটি তিনটি বিভাগের মধ্যে দু’টিতে বেশ ভালো স্কোর করেছে। শিশু সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পরিবেশের জন্য প্রথম স্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড (যেমন- বায়ুর গুণমান)। শিশুদের চারপাশের পরিবেশের ক্ষেত্রে (যেমন-স্কুল, ট্রাফিক পরিস্থিতি এবং সবুজ স্থান) দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। শিশুদের একাডেমিক এবং গণিতের দক্ষতার ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ড শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। যেখানে বাবা মায়েরা সন্তানের স্কুলের কাজ নিয়ে অনেক খোঁজখবর রাখেন।

পাঁচ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অর্ধেক। মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রেও ফিনল্যান্ড বেশ উদারনীতি মেনে চলে। মায়েরা আট সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি পান। এছাড়া মা ও বাবা একসাথে ১৪ মাসের বেতনভুক্ত ছুটি পান। অর্থাৎ এই ছুটি বাবা-মা ভাগ করে কাটাতে পারবেন। শিশুর বয়স তিন বছর না হওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত ছুটির কাটানোর ব্যাপারে আবেদন করা যেতে পারে। এই সুবিধাটি শুধুমাত্র ফিনল্যান্ডের বৈধ বাসিন্দারা পাবেন যারা ফিনল্যান্ড বা যেকোনও নর্ডিক, ইইউ বা ইইএভুক্ত দেশে সন্তান জন্ম দিয়েছেন এবং শিশুর জন্মের কমপক্ষে ১৮০ দিন আগে যারা স্বাস্থ্য বীমা করেছেন।
ফিনল্যান্ডে ভীষণ ঠাণ্ডা পরলেও সেই অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করলে চলাফেরা সহজ হয়ে যায়। এখানকার গ্রীষ্মকাল দুর্দান্ত কারণ এখানে ২২ ঘণ্টা সূর্যালোক থাকে।
নেদারল্যান্ডস
শিশুদের সুস্থতার জন্য ইউনিসেফের সামগ্রিক তালিকার শীর্ষে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রথম এবং তাদের দক্ষতা বিকাশে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দেশটি। সেখানে ১৫ বছর বয়সী ১০ জনের মধ্যে নয়জন তাদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট। ইউনিসেফের মতে, এটাই সর্বোচ্চ হার। ১০ জনের আট জন শিশু বলেছে যে তাদের পক্ষে বন্ধুত্ব করা সহজ।

যুক্তরাষ্ট্রে, বাচ্চাদের সবার থেকে আলাদা বা ভিন্ন কিছু হতে শেখানো হয়। কিন্তু নেদারল্যান্ডস পুরো উল্টো। এখানে একটা কথাই আছে, ‘শুধু নরমাল থাকো, পাগলের অভাব নেই’। আর এখানকার প্রবাদ হচ্ছে, ‘বিনয়ী হও, এটি তোমাকে আপনিই ভিড় থেকে আলাদা করবে।’ এ ধরনের মানসিকতার কারণে শিশুরা চাপমুক্ত শৈশব কাটাতে পারবে।
দেশটিতে একজন মা একটি সন্তান লালন-পালনের জন্য কমপক্ষে ১৬ সপ্তাহের বাধ্যতামূলক মাতৃত্বকালীন ছুটি পান, এবং বাবারা পিতৃত্বকালীন ছুটি পান ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত। শিশুর বয়স আট বছর না হওয়া পর্যন্ত বিনা বেতনে ছুটি নেওয়া যেতে পারে। এই সুবিধাটি সেই নাগরিকদের জন্য, যারা নেদারল্যান্ডসে থাকেন এবং বৈধভাবে চাকরি করেন।








