বিনোদন

ভারতের সিঙ্গেল স্ক্রিন: বিশ হাজার বন্ধ, সাড়ে পাঁচ হাজার ধুঁকছে

সিনেমা হলে দর্শকদের ভিড়, বাংলাদেশের সিনেমা প্রেমীদের উপস্থিতি. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

দিল্লীর মতি সিনেমা হল

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

একালে মাল্টিপ্লেক্সের আধিপত্য। কিন্তু সেই ষাট-সত্তর দশকে উপমহাদেশে রাজত্ব করেছে সিঙ্গেল স্ক্রিন। সিনেমা নিয়ে সবচেয়ে বেশী হইচই পাশের দেশ ভারতে। কিন্তু সেখানেও সিঙ্গেল স্ক্রিনের অবস্থা নাজেহাল!

সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে সিঙ্গেল স্ক্রিনের সমীক্ষা নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে সিঙ্গেল স্ক্রিন বন্ধ হওয়া নিয়ে আছে নানান চমকপ্রদ বর্ণনা।

বয়োজ্যেষ্ঠরা হয়তো মনে করতে পারবেন দিল্লির চাণক্য থিয়েটারের কথা। মাসের শেষে পকেটে টাকা কম থাকলেও সস্তায় টিকেট কেটে এক ব্যাগ ভুট্টার খই নিয়ে বসে সিনেমা দেখে ফেলা যেত অনায়াসে। সেসব এখন অতীত।

পুরানো ও ধ্বংসপ্রাপ্ত সিনেমা হলের ভেতর, ক্ষতিগ্রস্ত সিট ও ধুলো জমে থাকা. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ দিল্লির চাণক্য থিয়েটার যেমন এখন বিলাসবহুল শপিং কমপ্লেক্স হয়ে গেছে, তেমন অন্য অনেক সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হলও একই পরিণতি পেয়েছে। যেখানে কম বয়সী অবাক চোখে সিনেমার পর্দায় তাকিয়ে থাকা, টিনএজের প্রেমিকাকে নিয়ে লুকিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে রঙিন স্বপ্ন বোনার স্মৃতি, সেখানে এখন বড় মাল্টিপ্লেক্স।

কতগুলো হলের এই পরিণতি তা শুনলে চোখ কপালে ওঠাই স্বাভাবিক। ভারতে প্রায় পঁচিশ হাজার সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটার ছিল। এখন আছে প্রায় ছয় হাজার। অর্থাৎ প্রায় বিশ হাজার সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটার বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার, এমনটাই মনে করা হচ্ছে।

বিশিষ্ট আর্কিটেকচার বিশিষ্ট ভবন, বাংলাদেশের একটি পুরনো স্থাপনা. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ অন্ধ্রপ্রদেশে ৩৬০০ সিঙ্গেল স্ক্রিন হল ছিল, এখন আছে মাত্র ১৬০০টি, জানিয়েছেন তেলেঙ্গানা এক্সিবিটর্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট বিজয়েন্দ্র রেড্ডি। তিনি আরও জানান, যেই ১৬০০ টিকে আছে, তার মাঝে কিছু মাল্টিপ্লেক্সে রূপান্তরিত করা হবে। অন্যগুলোতেও নির্মাণ করা হবে কমার্শিয়াল স্পেস। এবছরই আরও ২০০টি বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যগুলোও বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন মালিকরা।

একই অবস্থা বিহারেও। কোভিডের আগে ২০০ সিঙ্গেল স্ক্রিন হল ছিল। এখন চলছে মাত্র ৪৫টি। এর মাঝেও অনেকগুলোই বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন হল মালিকরা। অথচ একসময় এগুলো হাউজফুল থাকতো।

গয়ার প্রেম টকিজ সিনেমা হলের মালিক ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দ্য সিটিজেন’-কে বলেন, ‘একসময়ে নিজেকে রুমে আটকে রাখতাম, টিকেট না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ সিনেপ্রেমীদের ভয়ে। এখন ৪৬০ আসনের এই হলে ১৫-২০ জন দর্শক থাকেন মাত্র। এখন এটা গরীবের হল। যাদের মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখার সামর্থ্য নেই, কেবল তারাই আসেন।’

অর্থের জন্য সংগ্রামরত মানুষ, কাগজের নোট হাতে ধরে আছেন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ সিনেমা এখন ওটিটিতে মুক্তি পায়, ইন্টারনেটে ফাঁস হয়। বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম এখন থিয়েটার নয়। পরিস্থিতি বদলানো শুরু করেছে যখন থেকে পিভিআর (১৯৯০), সিনেপোলিস (২০০১) এবং আইনক্স (২০০২)-এর মতো মাল্টিপ্লেক্স চেইনগুলো চালু হয়। উন্নত স্ক্রিন, টেকনোলজি, সাউন্ড সিস্টেমের কারণে সহজেই সিনেমাপ্রেমীদের মন জয় করে নেয় এগুলো। জৌলুস হারিয়ে যায় সিঙ্গেল স্ক্রিনের।

সিনেমাটোগ্রাফ ওউনার্স অ্যান্ড এক্সিবিটর্স’ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নিতীন দাতার বলেন, ‘আগে সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটারই ছিল বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। এখন ওটিটি, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম আছে হাতের মুঠোয়। কোনো সিনেমা হলে দেখতে যাওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় মোবাইলে বা টেলিভিশনে দেখা যায়। কেন মানুষ থিয়েটারে ছবি দেখবে তাহলে পয়সা খরচ করে? তারা হলে ছবি দেখতে আসে তখনই, যখন ছবিটি খুবই ভালো মানের হয়।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আগে সিনেমার কোনো একটি দৃশ্য পছন্দ হলে তা আবার দেখার জন্য দর্শক হলে যেত। এখন সেটা সামাজিক মাধ্যমেই চলে আসে। অপছন্দের দৃশ্য বাদ দিয়ে দেখার সুযোগও পায়। করোনাকালে সবাই ছোট পর্দায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে আর সেটাতেই স্বস্তি পায়। একারণেই সিনেমা খুব ভালো না হলে মানুষ ঘর থেকে বের হতে চায় না সিনেমার জন্য। তাও সেটা হয় সিনেমার ভালো রিভিউ পড়ার পরে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে সিনেমা ফ্লপ হতেও তিন দিন লাগতো-শুক্র, শনি এবং রবি। এই তিন দিনে এক্সিবিটররা ভাল অর্থ তুলে ফেলতো। এখন যেদিন মুক্তি পায়, সেদিনই হোয়াটসঅ্যাপ এবং অন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে নেগেটিভ রিভিউ চলে আসে। শুক্রবারেই সবাই জেনে ফেলে সিনেমাটি ভালো নাকি খারাপ।’

সিনেমা হলে দর্শকদের ছবি, বেশিরভাগই যুবক ও তরুণ. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ ব্যবসা কমে গেলেও খরচ তো কমেনি, কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। আগে যখন ব্যবসা ভালো ছিল তখন প্রতিদিনের খরচ, সরকারের ট্যাক্স দেয়া কঠিন ছিল না। এন্টারটেইনমেন্ট ট্যাক্স ছাড়াও অনেক রকম ট্যাক্স ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মানুষ সিনেমা দেখতে আসে না, কিন্তু খরচ তো হচ্ছেই। ৭৫ বছর ধরে আমাদের থেকে এত বড় অংকের ট্যাক্স নিয়েও সরকার এই খাতে কোনো বিনিয়োগ করেনি বললেই চলে। সরকার শুধু আগ্রহী ফিল্ম সিটিগুলোতে বিনিয়োগ নিয়ে; প্রতিটি রাজ্যই নিজস্ব ফিল্ম সিটি চায়। হলই যদি না থাকে, বিশেষ করে যেখানে মাল্টিপ্লেক্স নেই, সিনেমাগুলো কোথায় দেখানো হবে?,” প্রশ্ন করেন নিতীন দাতার।

হল মালিকদের পকেট ফাকা, এই অবস্থায় উন্নত স্ক্রিন, সাউন্ড সিস্টেম এগুলো কেনাও সম্ভব নয়। প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত মানের লেজার প্রজেক্টর কিনতে খরচ কোটি রুপির বেশি। টিকবে ছয় বছর। এই ছয় বছরে বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনা অসম্ভব বর্তমান পরিস্থিতিতে। প্রযোজক-নির্মাতারাও মাল্টিপ্লেক্সের কথা ভেবেই সিনেমা নির্মাণ করেন, সিঙ্গেল স্ক্রিনের কথা ভাবেন না, এমনটাই মনে করেন হল সিঙ্গেল স্ক্রিন হলের মালিকরা। আর তাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ধুকে ধুঁকে দিন পার করছেন তারা। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

বিষয়:বিগ স্ক্রিনলিড বিনোদনসিঙ্গেল স্ক্রিনসিনেমাসিনেমা হল
প্রতিবেদক

চ্যানেল আই অনলাইন

চ্যানেল আই অনলাইন

আরও →

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…