মোহাম্মদ আক্তার আলম: লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উপ শহর দালালবাজার সংলগ্ন খোয়া সাগর দিঘির পাড় প্রতিদিন বিকেলে ভ্রমণপ্রেমীদের ভিড়ে মুখর থাকে। খোলা আকাশের নিচে মুক্ত প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে জেলার বিভিন্ন প্রান্তর থেকে বিভিন্ন বয়সীরা আসেন এখানে। দীঘির জল ছুঁয়ে আসা শীতল হাওয়া তাদের মন ছুঁয়ে যায়। ভ্রমণপিপাসুদের ছায়া হিসেবে কাজ করে বেশকিছু কড়ই গাছ। এখানে গল্পে গল্পে দারুণ সময় কাটান তরুণ-তরুণীরা। অনেকে মোবাইল ফোনে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
১৭৫৫ সালে এলাকাবাসীর ব্যবহারের পানি সংরক্ষণের জন্যেই তৎকালীন রাজা জমিদার ব্রজবল্লভ রায় এর উদ্যোগে ২৫ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত খোয়া সাগর দিঘি খনন করেন। পরবর্তীতে জমিদার রাজা গৌর কিশোর রায় পুকুরটি সংস্কার করেন। নামকরণ হিসেবে জানা যায়, শীতকালে কুয়াশার কারণে দীঘির এক পাড় থেকে অন্য পাড় দেখা যায় না। কুয়াশাকে লক্ষ্মীপুরের আঞ্চলিক ভাষায় খোয়া বলে। তাই ঢেউ ছাড়া সাগরের মতো দেখতে দিঘির নাম খোয়া সাগর দিঘি হিসেবেই পরিচিতি পায়।

খোয়া সাগর দিঘিকে দৃষ্টিনন্দন ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য পর্যটন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিশেষ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। দিঘির উত্তর ও পশ্চিম পাশে গাইডওয়াল এবং ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। দিঘিমুখী করে খোলা আকাশের নীচে চেয়ার দিয়ে দর্শনার্থীদের বসা ও সোলার ল্যাম্পপোস্ট দিয়ে রাত্রিকালীন আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিঘিতে বেড়ানোর জন্য কয়েকটি নান্দনিক নৌকাও রয়েছে। পাড়ে ফুল গাছ লাগানো হয়েছে। ওয়াকওয়েতে রেলিং দিয়ে শিশুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
একইসঙ্গে দিঘিকে ঘিরে পর্যটনের উন্নয়নে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। পর্যটকদের চলাচলের জন্য ইট দিয়ে রাস্তা নির্মাণের পাশাপাশি পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সন্ধ্যা বেলায় ভ্রমণপিপাসুদের গল্প জমে। দিঘির চারপাশে বহু রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। দিঘির সিঁড়িতে পা রেখে স্বচ্ছ জলে হাত-মুখ ধুয়ে নেন কেউ কেউ।
এছাড়া খোয়া সাগর দিঘির সঙ্গে মিশে আছে এক রূপকথার গল্প। কোন এক সময় বর তার নববধূকে নিয়ে দিঘির পাড় দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন বরের পানির পিপাসা হলে যাত্রাবিরতি টেনে দিঘিতে নেমে পানি পান করেন। নববধূও পানি পানের জন্য নেমেছিলেন। কিন্তু নববধূ অঞ্জলি ভরে পানি পান করতে গেলে তার পা দুটি ধরে কে যেন নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ওই বধূ আর ফিরে আসেননি। সেই স্থানে গভীর গর্ত হয়ে আছে। বিগত সময়ে শুষ্ক মৌসুমে প্রচণ্ড খরায় দীঘিটি শুকিয়ে গেলেও ওই জায়গাটি কোনোভাবেই শুকায়নি। বর্তমানে পানি সব সময় টুইটম্বুর থাকলেও সেই সময়ের এই উপকথা এলাকাবাসী প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বলে যাচ্ছে।

চর লামচি গ্রামের বাসিন্দা মো. ইউছুফ বলেন, পর্যটকদের অসচেতনতার কারণে সৌন্দর্য্য হারাচ্ছে দিঘিটি। বসার জন্য দেওয়া পাকা বৃত্তাকার বেঞ্চের মাঝখানে ময়লা ফেলে তা নোংরা করে রাখা হয়েছে। খাবার পলিথিন ও খোসা ফেলা হচ্ছে দিঘির পানিতে। যা দিঘির পানিকে দূষিত করছে। সাংবাদিক ভাস্কর রায় চৌধুরী বলেন, দিঘির চারপাশে ওয়াকওভার নির্মাণ করলে সৌন্দর্য বাড়বে বহুগুণ।
নন্দনপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও আদিব ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস এর স্বত্ত্বাধিকারী কে এম মোবারক উল্ল্যাহ শিমুল বলেন, প্রাচীন দিঘিকে ঘিরে গড়ে উঠা বিনোদন কেন্দ্রকে পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণা করা সময়ের দাবি।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক রাজীব কুমার সরকার বলেন, খোয়া সাগর দিঘির পাড় এখন জেলাবাসীর বিনোদনের অন্যতম স্থান। দিঘির চারপাশে গাইডওয়ালসহ সৌন্দর্য্যবর্ধনের পরিকল্পনা জেলা প্রশাসনের রয়েছে।








