দেশের বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহগুলোর অন্যতম কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯তম পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত।
বৃহস্পতিবার ২৮ মে সকাল ৯টায় বৃষ্টির মধ্যেও বিপুলসংখ্যক মুসল্লির উপস্থিতিতে ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
শোলাকিয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে তিন দফা শটগানের গুলি ফুটিয়ে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় ঈদের জামাত। জামাতে ইমামতি করেন কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হয়বতনগর এ ইউ কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই।

দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে রেল মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘শোলাকিয়া স্পেশাল’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন চালানো হয়। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল ৬টায় কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। নামাজ শেষে দুপুর ১২টায় ট্রেন দুটি পুনরায় নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ঈদগাহ ময়দানে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও দূরদূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় শোলাকিয়ায় মুসল্লির উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। কোরবানির প্রস্তুতি এবং আশপাশের মসজিদে আগে জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ায় তুলনামূলক কম মুসল্লি উপস্থিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জামাতকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠজুড়ে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল। নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা হয় আর্চওয়ে, ওয়াচ টাওয়ার, সিসিটিভি ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারি ব্যবস্থা। পাশাপাশি বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, কুইক রেসপন্স টিম, ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়। স্কাউট সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জামাতে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল, কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল এবং শান্তিপূর্ণভাবে জামাত সম্পন্ন হওয়ায় প্রশাসন সন্তুষ্ট। জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের জামাত চলাকালে শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ চারজন নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকেই শোলাকিয়াকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এবারও কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করতে হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন ঈদগাহ হিসেবে পরিচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, ১৮২৮ সালে এখানে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন। সেখান থেকেই ‘সোয়া লাখিয়া’ নামটি সময়ের ব্যবধানে ‘শোলাকিয়া’ নামে পরিচিতি পায়। স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহাসিক এই ঈদ জামাতকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির আওতায় আনা উচিত।








