তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বহু নাটকীয় মুহূর্ত এসেছে। তবে থালাপথি বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দিনটি ছিল একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের! এটি শুধু একটি শপথ অনুষ্ঠান ছিল না; বরং নতুন রাজনৈতিক যুগের ঘোষণার মতোই সাজানো হয়েছিল পুরো আয়োজন!
কালো ট্রাউজার ও ব্লেজারে মঞ্চে হাজির হওয়া বিজয় যেন শুরুতেই বুঝিয়ে দেন তিনি প্রচলিত তামিল রাজনীতির ছকে হাঁটতে চান না। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পোশাক পরিহার করে বিজয় যেন এদিন নতুনের কেতন উড়ালেন!
বিজয়ের শপথ অনুষ্ঠানের পুরো আয়োজনটিতে ছিল আধুনিকতা, ভিজ্যুয়াল পরিকল্পনা ও সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক উপস্থাপনার স্পষ্ট ছাপ। যেন টেলিভিশনের দর্শক, ইনস্টাগ্রাম রিলস আর ভাইরাল ক্লিপে অভ্যস্ত নতুন প্রজন্মের জন্যই তৈরি করা হয়েছে এই রাজনৈতিক মঞ্চ!
তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাধারণত নেতারা শপথ শেষ করেই আনুষ্ঠানিকতা সেরে মঞ্চ ত্যাগ করেন। কিন্তু বিজয় সেই পথ অনুসরণ করেননি। শপথের পর তিনি সরাসরি জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন। এরপর মঞ্চেই ক্যামেরার সামনে সরকারি ফাইলে স্বাক্ষর করেন, যা ছিল পুরোপুরি প্রতীকী কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী এক রাজনৈতিক বার্তা।
ভাষণে থালাপথি বিজয় স্পষ্টভাবে বলেন,“টিভিকের মধ্যে কোনো সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র নেই। আমিই একমাত্র নেতৃত্ব।”
বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় অভ্যন্তরে ‘শ্যাডো অ্যাডভাইজার’, গোপন বলয় কিংবা অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্র নিয়ে যে জল্পনা ছিল, সেটি শুরুতেই থামিয়ে দিতে চেয়েছেন তিনি। কারণ তামিলনাড়ুর রাজনীতি বরাবরই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, উত্তরাধিকার রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রভাবিত।
তবে বিজয়ের ভাষণ শুধু ক্ষমতার বার্তাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে আবেগও ছিল প্রবলভাবে উপস্থিত। তিনি বারবার বলেছেন, তার সরকার হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান- সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে।
সবচেয়ে বেশি করতালি পাওয়া বক্তব্যগুলোর একটি ছিল “আপনি আমার বন্ধু হোন বা শত্রু, তামিলনাড়ুর ৮ কোটি মানুষই আমার মানুষ।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল ‘সিনেম্যাটিক বিজয়’-এর পরিচিত আবেগঘন ভাষা, যা রাজনৈতিক বিভাজন ছাড়িয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম।
নিজের রাজনৈতিক যাত্রাপথের অপমান, সমালোচনা ও বাধার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, “আমি অপমান সহ্য করেছি, নানা বাধার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু মানুষ সবসময় আমার পাশে থেকেছে।”
অনেকে মনে করছেন, বিরোধিতা ও সমালোচনাকে রাজনৈতিক বৈধতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি, যা ভারতের বহু সফল আঞ্চলিক নেতার পরিচিত কৌশল।
একইসঙ্গে জনগণের প্রত্যাশার চাপ সম্পর্কেও সচেতন দেখা গেছে নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে। তিনি স্বীকার করেন, প্রশাসনকে স্থিতিশীল হতে সময় লাগে। তবে সেই ‘সময় চাওয়ার’ মধ্যেই দ্রুত সিদ্ধান্তের বার্তাও দিয়েছেন।
মঞ্চেই তিনি ২০০ ইউনিট ফ্রি বিদ্যুৎ, বিশেষ অ্যান্টি-ড্রাগ টাস্কফোর্স এবং নারীদের নিরাপত্তায় আলাদা সুরক্ষা ইউনিট গঠনের ঘোষণা দিয়ে সরকারি নথিতে স্বাক্ষর করেন।
বিশেষ করে মাদকবিরোধী অবস্থানকে গত এক বছর ধরে তামিলাগা ভেত্রি কাজগাম (টিভিকে) –এর অন্যতম বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দলটি এটিকে তামিলনাড়ুর ভবিষ্যৎ রক্ষার ‘নৈতিক লড়াই’ হিসেবেও উপস্থাপন করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা খাতও সরাসরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান বিজয়।
যুবশক্তি, ডিজিটাল টিম ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের মিশ্রণ
বিজয়ের আশপাশের রাজনৈতিক বলয়ও বেশ ব্যতিক্রমী। সেখানে রয়েছেন অনুগত সংগঠক, ডিজিটাল কৌশলবিদ, টেকনোক্র্যাট, পেশাজীবী ও পুরোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞরা।
এই বলয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এন আনন্দ, যিনি ‘বুসি আনন্দ’ নামেই বেশি পরিচিত। টিভিকে গঠনের আগেই বিজয়ের ফ্যান ক্লাবগুলোকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
এছাড়া রাজনৈতিক কৌশলবিদ হিসেবে আলোচনায় আছেন আধব অর্জুনা। সাবেক জাতীয় পর্যায়ের বাস্কেটবল খেলোয়াড় এই তরুণ নেতাকে দলটির আধুনিক রাজনৈতিক মাথা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হওয়া ২৯ বছর বয়সী কীর্তনাও নজর কেড়েছেন। আটটি ভাষায় দক্ষ এই তরুণ নেত্রী প্রচারণার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হন।
অন্যদিকে, পি ভেঙ্কটারামানান–এর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি ঐতিহাসিক বলেও আলোচনা হচ্ছে। প্রায় সাত দশক পর কোনো ব্রাহ্মণ নেতা তামিলনাড়ুর মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন।
অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বিজয়ের পাশে আছেন সাবেক এআিএডিএমকে নেতা কে এ সেঙ্গোট্টাইয়ান। নয়বারের বিধায়ক এই রাজনীতিক প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতায় দলকে শক্তি জোগাবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
বিজয়ের সামনে কঠিন বাস্তবতা
তবে শপথের প্রথম দিনের আবেগ ও আয়োজনের পর এখন বিজয়ের সামনে অপেক্ষা করছে বাস্তব রাজনীতির কঠিন পরীক্ষা। তামিলাগা ভেত্রি কাজগাম (টিভিকে) একক সংখ্যাগরিষ্ঠ না হওয়ায় সরকার টিকিয়ে রাখতে নির্ভর করতে হবে মিত্র দলগুলোর ওপর। পাশাপাশি প্রশাসন পরিচালনা, অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলার মতো চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে নতুন সরকারকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা মূলত ‘বিজয়’ নামের প্রতীককে ভোট দিয়েছেন; কিন্তু এখন তাকে প্রমাণ করতে হবে তিনি শুধু তারকা নন, কার্যকর প্রশাসকও।
আর সেখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সিনেমার ক্যারিশমা কি বাস্তব প্রশাসনে রূপ নিতে পারবে? তবে প্রথম দিনের আয়োজনেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছেন থালাপথি বিজয়, আর সেটা হচ্ছে- তার সরকার অতীতের মতো দেখতে চায় না। নিউজ এইটিন








