ওয়াশিংটন ও তেহরানের উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তবে তা আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেবে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে, যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করবে বলেও শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে না এলে বা সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ না করলে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
খামেনি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রায়ই বলেন তিনি জাহাজ পাঠিয়েছেন। ইরানি জাতি এসব দেখে ভীত হবে না, এসব হুমকিতে ইরানি জনগণ বিচলিত হবে না।’
খামেনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো দেশের ওপর হামলার উদ্যোগ নিই না এবং চাইও না। কিন্তু কেউ যদি ইরানি জাতির ওপর হামলা বা হয়রানি চালায়, তাহলে ইরানি জনগণ তার জবাব কঠোরভাবে দেবে।’
তেহরান জানিয়েছে, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ এখনও রয়েছে। ইরান ‘ন্যায্য’ আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে এমন আলোচনা হতে হবে যাতে তাদের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা না করা হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ছয়টি ডেস্ট্রয়ার, একটি বিমানবাহী রণতরী এবং তিনটি লিটোরাল কমব্যাট শিপ ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। দমন-পীড়নের পর এখন সেই বিক্ষোভ অনেকটাই স্তিমিত।
খামেনি বিক্ষোভগুলোকে ‘অভ্যুত্থান’-এর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এই ‘বিদ্রোহের’ লক্ষ্য ছিল দেশের শাসনকেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানা।
এর আগে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথে অগ্রগতি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ইরানের সেনাপ্রধান যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক হামলা থেকে বিরত থাকার হুঁশিয়ারি দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে, যদিও হামলার হুমকিও তিনি জিইয়ে রাখেন।
ইরানবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের পর ট্রাম্প হস্তক্ষেপের হুমকি দিলে যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীর নেতৃত্বে ইরানের উপকূলে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানি বলেন, “সাজানো মিডিয়া যুদ্ধের বাড়াবাড়ির বিপরীতে, আলোচনার কাঠামোগত প্রস্তুতি এগোচ্ছে।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, বড় ধরনের সংঘাত হলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইরানি প্রেসিডেন্সির বরাতে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে ফোনালাপে তিনি বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই যুদ্ধ চায়নি এবং কোনোভাবেই চায় না। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যুদ্ধ ইরান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অঞ্চলের কারও স্বার্থে নয়।”
গতকাল ট্রাম্পও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ চলছে বলে নিশ্চিত করেন।
ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, “ইরান আমাদের সঙ্গে কথা বলছে। দেখা যাক কিছু করা যায় কি না; না হলে কী হয় তা দেখা যাবে-আমাদের একটি বড় নৌবহর সেখানে যাচ্ছে।” তিনি যোগ করেন, “তারা আলোচনা করছে।”
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি গতকাল ইরানে গিয়ে আলি লারিজানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন—উদ্দেশ্য ছিল ‘অঞ্চলের উত্তেজনা কমানো’।
সংঘাতের আশঙ্কা
মার্কিন নৌবহর আসার পর ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা বেড়েছে। ইরান সতর্ক করেছে, হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, জাহাজ ও মিত্রদের (বিশেষ করে ইসরায়েল) লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে।
ট্রাম্প বলেছেন, তার বিশ্বাস ইরান সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে যাবে।
ইরান জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আলোচনার বাইরে থাকলে তারা পারমাণবিক আলোচনায় প্রস্তুত।
ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে যেকোনো হামলা থেকে সতর্ক করে বলেন, তার বাহিনী ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক ও সামরিক প্রস্তুতিতে’ রয়েছে।
তিনি বলেন, “শত্রু যদি ভুল করে, তবে নিঃসন্দেহে তা নিজের নিরাপত্তা, অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং জায়নবাদী শাসনের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করবে।”
তিনি আরও বলেন, ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা ‘নির্মূল করা যাবে না’।
নৌ মহড়া
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে ‘দুই দিনের সরাসরি গোলাবর্ষণসহ নৌ মহড়া’ চালাবে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
সেন্টকম আইআরজিসিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর কাছে ‘অনিরাপদ ও অপেশাদার আচরণ’ না করার সতর্কতা দেয়।
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখন আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী কীভাবে নিজেদের এলাকায় লক্ষ্যভেদ অনুশীলন করবে, তা নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করে। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই সিদ্ধান্ত নেয়, যা ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যখন তারা ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের সংঘাতে স্বল্প সময়ের জন্য যুক্ত হয়েছিল।








