সিনেমার কারিগরি শিখলেই সিনেমা বানানোর নেশা জন্মে এমন নয় ব্যাপারটা। নেশা জন্মে সিনেমা জানতে জানতে। আমার সিনেমা জানার যাত্রায় অন্যতম একটা অনুপ্রেরণা হল ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্মাতাদের নিয়ে, বিশ্ব চলচ্চিত্র নিয়ে, সিনেমা সংক্রান্ত বই নিয়ে বলে যাচ্ছেন চিরতরুণ সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন, তাঁর ক্লাস।
তিনি নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জন, আমাদের অঞ্জন স্যার।
কোনো কোনো মানুষ যেমন একটা বিশাল বটগাছের মতোন হোন, অনেক দূর অবধি বিস্তৃত হয় যার ডালপালা। অঞ্জন স্যার এমন একজন মানুষ ছিলেন। অঞ্জন স্যারের কথা মনে পড়লেই হাস্যোজ্জ্বল একটা মুখ চোখে ভাসে, সবসময় একটা গোলাকার পেন্ডেন্ট গোলায় ঝোলানো, হাতে ট্যাটো, তীক্ষ্ণ চোখের এক উচ্ছ্বল মানুষ। আড্ডা জমানো, ক্লাস জমানো, এমনকি মানুষ জমানো মানুষ।
এমন ধাক্কা এমন হতচকিত মুহূর্ত জীবনে খুব একটা আসে নি আমার। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি,২০২৫-এ শাহীন আপা (শাহীন আখতার)-র সাথে কথা বললাম, উনি বললেন দূর থেকে কাঁচের ভেতর বা ভিডিওতে অঞ্জন স্যারকে দেখতে বলেছিলো ব্যাঙ্গালোরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, উনি এভাবে দেখতে চান নি। আমি বললাম, ‘ভালো করেছেন আপা।’ ভাবলাম সময় লাগবে খানিকটা সুস্থ হতে, আপাও তাই বললেন।
কিন্তু এমন খবর এসে পৌঁছালো পরের দিন যে গলায় কচ্ছপ আটকে যাচ্ছিলো বার বার। সম্পর্ক যখন আত্মিক, তখন এর অনুভূতি গভীর আমার কাছে। উত্তরাধিকারের ভাবনাও আমার কাছে ভিন্ন, রক্তসম্পর্কিত যত না তারচে বেশি সৃজনশীলতা-ভাবনা-আদর্শের বীজ সম্পর্কিত।
এই ক’দিন আগে আমরা বন্ধুরা পরিবাগের আড্ডার গলিতে, আমাদের মেমোরি লেনে বসে স্যারের কথাই বলছিলাম, ঘোরে বেঘোরে। এক বন্ধু, চিত্রগ্রাহক মাজহারুল রাজু বললেন, স্যার শেষের দিকে আমাদের ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করতেন। স্যারকে ঘিরে আমাদের স্মৃতিরা তখন হামলে পড়তে লাগলো একে একে। তখন মনে হল গলিটা কোনো ছায়াপথ। ভেসে বেড়াচ্ছে, যে গ্যালাক্সি কেবল ইমেজে ভাসে সেরকম কোথাও কোনো জগতে। মনে হল আমরা সকলে ক্লাসভর্তি কিংবা গলিভর্তি উজ্জ্বল বা অনুজ্জ্বল সন্তানেরা যারা কিছুই করতে পারলাম না স্যারের জন্য।
স্যারের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট কেবল শোনা যায় কোথা থেকে যেন। মনে হয় স্যার বলছেন গদারের উক্তি – “A story should have a beginning, a middle and an end, but not necessarily in that order….”। মনে হয় অর্ডার ভেঙে যদি অতীত উল্টেপাল্টে দিয়ে ফিরে আসতেন স্যার।
লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এর একটা কথা আমার বেশ মনে হয় যেকারও নাই হয়ে যাওয়ার স্মৃতিতে। সন্দীপন লিখেছিলেন -“..জীবিতের শোক মৃত গ্রহণ করে না।” তবু অঞ্জন স্যারের প্রিয় গাছের ডাল যেদিন আপা দেন স্যারের সমাধিতে লাগাতে, আমি আমারও প্রিয় অপরাজিতার চারাটাও রোপন করে আসি। গাছেরা কি ভাষা বোঝে মানুষের? মাঝে মাঝে আমার মনে হয় বোঝে। ক’দিন পরে দেখি গাছগুলো মাটি ছাড়িয়ে কিংবা ছড়িয়ে বাড়ছে।
স্যারের ডায়েরিগুলোর প্রতি আমার একটা টান ছিল, লোভও বটে। যে ডায়েরি হাতে নিয়ে স্যার ক্লাসে ঢুকতেন। যে ডায়েরির পাতা উলটে কোনো নির্মাতার উদ্ধৃতি নিয়ে বলতে বলতেই বুঝিয়ে দিতেন aesthetics of cinema। কোনোদিন ভাবিনি এইভাবে ডায়েরিগুলো সব দেখা হবে, শুধু ডায়েরিগুলোই যখন থাকবে।
আমি বিশ্বাস করি অঞ্জন স্যারের যাপন, ভাবনা কিংবা নির্মাণ অনেক অনেককাল পরেও জ্বলজ্বল করবে। স্যার শেষ পর্যন্ত জীবনের সমস্ত সংকটকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েই বেঁচে গেলেন। এরকম শেষ দিন অবধি কেবল কাজ নিয়ে, শিল্প নিয়ে ভেবে যাওয়ার যাপন আমার কাছে তুমুল আকাঙ্খিত।
‘মেঘমল্লার’ খ্যাত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জনের প্রথম প্রয়াণ দিবস ২৪ ফ্রেব্রুয়ারি। তার স্মৃতির উদ্দেশে লিখেছেন নির্মাতার ছাত্র এবং তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা জুয়েইরিযাহ মউ। লেখাটি তার প্রকাশিতব্য ‘বাতিল ডাকবাক্সে জমতে থাকা জল’ বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে নেয়া।








