মান্দারিন ভাষায় লেখা উপন্যাস ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ জয় করল আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার ২০২৬। এই প্রথম মান্দারিন ভাষার কোনো সাহিত্যকর্ম মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার অর্জন করল। যৌথভাবে পুরস্কার পেয়েছেন বইটির লেখক ইয়াং শুয়াং জি এবং অনুবাদক লিন কিং।
আজ (২০ মে) বুধবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, লন্ডনের টেট মডার্নে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড সমানভাবে ভাগ করে নেবেন লেখক ও অনুবাদক।
‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ মূলত প্রেম, ইতিহাস, ভাষা ও ঔপনিবেশিক ক্ষমতার জটিল সম্পর্ককে ঘিরে নির্মিত একটি উপন্যাস। গল্পের পটভূমি ১৯৩৮ সালের তাইওয়ান। জাপানের নাগাসাকি থেকে তরুণ লেখক আওয়ামা চিজুকো জাহাজে করে তাইওয়ানে আসেন। জাপানি ঔপনিবেশিক সরকারের আমন্ত্রণে এলেও সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। বরং তিনি তাইওয়ানের প্রকৃত জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও খাবারের স্বাদ জানতে চান।
ভ্রমণের একপর্যায়ে তার দোভাষী হিসেবে নিয়োগ পান তরুণী তাইওয়ানি নারী চিজুরু। বুদ্ধিমতী ও যত্নশীল এই তরুণীর সঙ্গে ধীরে ধীরে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে চিজুকোর। ট্রেনভ্রমণ, স্থানীয় খাবার ও দীর্ঘ আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে তাদের সম্পর্ক প্রেমে রূপ নেয়। তবে চিজুরুর অদৃশ্য দূরত্ব একসময় চিজুকোকে ভাবিয়ে তোলে, যার প্রকৃত কারণ তিনি বুঝতে পারেন বিচ্ছেদের পর।
আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীর প্রধান নাতাশা ব্রাউন বলেন, উপন্যাসটি একই সঙ্গে প্রেমের গল্প এবং গভীর পোস্টকলোনিয়াল বিশ্লেষণ হিসেবে কাজ করেছে। তার ভাষায়, বইটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বহুস্তরীয় নির্মাণে সমৃদ্ধ, যা বিচারকদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা তৈরি করেছে। ১৯৩০ এর দশকে জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে ভালোবাসা কি ক্ষমতার বৈষম্যকে অতিক্রম করতে পারে?
লেখক ইয়াং শুয়াং জি একাধারে কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, মাঙ্গা ও ভিডিও গেমের চিত্রনাট্যকার এবং সাহিত্যসমালোচক। ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ তার প্রথম উপন্যাস। এর আগে বইটি ২০২৪ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেটেড লিটারেচার এবং এশিয়া সোসাইটির বাইফাং শেল বুক প্রাইজ অর্জন করে। ইতিমধ্যে উপন্যাসটি জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান, ইতালীয়, ডাচ ও ড্যানিশসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
অন্যদিকে, তাইওয়ানিজ-আমেরিকান লেখক ও অনুবাদক লিন কিং বর্তমানে তাইপে ও নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। তার লেখা বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি পেন ডাউ ছোটগল্প পুরস্কারও পেয়েছেন। ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ ছাড়াও তিনি ‘দ্য বয় ফ্রম ক্লিয়ারওয়াটার’ গ্রাফিক নভেল সিরিজ অনুবাদ করেছেন।
উপন্যাসের পটভূমি ও ইতিহাস নিয়ে ইয়াং শুয়াং জি বলেন, কোরিয়া ও তাইওয়ান উভয়ই একসময় জাপানি সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ছিল। তবে কোরিয়ানদের তুলনায় তাইওয়ানিদের অনুভূতি অনেক বেশি জটিল যেখানে বিরক্তি, দ্বিধা ও নস্টালজিয়া একসঙ্গে মিশে আছে। সেই জটিল অতীতকে সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি।
লিন কিং বলেন, জাপানি শাসনে নিপীড়ন থাকলেও তাইওয়ানের মানুষের জীবন থেমে ছিল না। সেখানে প্রেম, হাসি, খাবার, সিনেমা ও দৈনন্দিন জীবন ছিল। কেবল ট্রমার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সংস্কৃতিকে বিচার করা ঠিক নয়, আর এই দৃষ্টিভঙ্গিই ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ এর সবচেয়ে বড় শক্তি।








