সিলেটে কুশিয়ারা তীরবর্তী ৬ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। দুটিতে রয়েছে অপরিবর্তিত। আর সুরমা, ধলাই, পিয়াইন, লোভা ও সারি নদী তীরবর্তী ৫ উপজেলায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
জেলার এখনো অসংখ্য মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও বিজিবির উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এখনো জেলার দুর্গম অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছেনি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় দুর্গম এলাকার দুর্গত মানুষদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোথাও উন্নতি কোথাও অবনতি
গতকাল মঙ্গলবার সিলেটের যেসব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার। আগের দিন থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে সিলেট সদর, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায়। আর পরিস্থিতি অপরবর্তিত রয়েছে জকিগঞ্জ ও বিশ্বনাথের।
কুশিয়ারা নদীর পানি মঙ্গলবার (২১ জুন) সন্ধ্যা ৬টায় সকল পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কুশিয়ারায় পানি বৃদ্ধির ফলে বিয়ানীবাজার উপজেলার কুড়ারবাজার, মুড়িয়া, লাউতা, শেওলা, মাথিউরা, মোল্লাপুর ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। উপজেলা প্রশাসনের হিসেব মতে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৩ হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। মঙ্গলবার পর্যন্ত সরকারিভাবে সাড়ে ৩০টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করা সোহেল মিয়া জানান, নিজেদের জীবন নিয়ে কোনোমতে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছি। ঘরে ধান-চাল সব রাখিয়া আইছি । নিজের একটা নৌকাও নাই যে এগুলো লগে লইয়া যাইতাম। ঘরের মধ্যে ধান-চাল পানিতে ভিজিয়া নষ্ট হয়েছে। এখন মানুষের হাতের দিকে চাইয়া আছি। কেউ দিলে আমরা খাইতাম। রুজি রোজগারও নাই।’
নূরউদ্দিন জানান, ‘বাজার-ঘাট সব বন্ধ হয়ে আছে। রুজি নাই। কে-কত দিন সাহায্য দিয়া চালাইব। নিজের যুদ্ধ নিজেরেই করা লাগব।’
বালাগঞ্জ উপজেলায়ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উপজেলার প্রায় ৮০ ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধির ফলে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় বন্যা আক্রান্ত এলাকায় অন্তত ৬ ইঞ্চি পানি বেড়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের ইলাশপুর এলাকায় সিলেট-মৌলভীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার অন্তত ৬০ ভাগ মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি রয়েছেন।
ওসমানীনগর উপজেলার কুশিয়ারা তীরবর্তী সাদিপুর, গোয়ালাবাজার ও পৈলনপুর ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। উপজেলার বাকি এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গোলাপগঞ্জের কুশিয়ারা তীরবর্তী ৬ ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ও সুরমা তীরবর্তী ৩ ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় ধীরগতিতে উন্নতি হচ্ছে। একইভাবে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সুরমা তীরবর্তী কুচাই, বরইকান্দি ও মোল্লারগাঁও ইউনিয়নে উন্নতি হলেও ফেঞ্চুগঞ্জ হয়ে কুশিয়ারার পানি ঢুকে মোগলাবাজার, দাউদপুর, জালালপুর ও সিলাম ইউনিয়নে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সিলেট সদর, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ধীরগতিতে পানি নামছে। আর জকিগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরবর্তিত রয়েছে।
জকিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি ঘটছে
অবিরাম বৃষ্টিপাত কমলেও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সিলেটের জকিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি ঘটছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকার ডাইকে ভাঙন দেখা দিচ্ছে।
গ্রামীণ সড়কের পাশাপাশি তলিয়ে গেছে জকিগঞ্জ-সিলেটের প্রধান যোগাযোগ সড়ক। গ্রামে এখন চলাচলে নৌকাই একমাত্র ভরসা। বন্যা কবলিত এলাকায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে জকিগঞ্জে ৪৬টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে ৮৮৫ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
জকিগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর বড়চালিয়া, সুপ্রাকন্দী, জামডহর, বেউর, লক্ষীবাজার, গড়রগ্রাম, আমলশীদ, পিল্লাকান্দি, রারাই, মানিকপুর, সহিদাবাদ, ভক্তিপুর, লোহারমহল, পীরনগর, লাফাকোনা ও সুরমা নদীর মুন্সিবাজার, রঘুরচক, হাজীগঞ্জ, আটগ্রাম, বড়বন্দ, শরীফাবাদ, পরচক, বারকুলিরচক, উত্তর খিলোগ্রামসহ অন্ততপক্ষে ৪০টি স্থানে সুরমা-কুশিয়ারার বাঁধ ভেঙে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় জকিগঞ্জের আমলশীদ সুরমা-কুশিয়ারার মিলনস্থলে পানি বিপৎসীমার ১৮৬ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম ফয়সাল জানান, বন্যায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতিতে লোকজনকে সহায়তা করতে সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম চালু আছে। চালের পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবারও বিতরণ করা হচ্ছে। লোকজনকে নিরাপদে রাখতে প্রশাসন তৎপর আছে।
বন্যায় সিলেটে চিড়া-মুড়ির দাম বেড়ে দ্বিগুণ
বন্যায় সিলেটে চিড়া ও মুড়ির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বেড়েছে গুড়, বোতলজাত পানির দামও। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামেও মিলছে না এসব পণ্য।
বন্যা আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের জন্য চিড়া, মুড়ি ও গুড়ের চাহিদা বেড়েছে। সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে সিলেটে এসব শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
চাহিদা বাড়ার ফলে এসব পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে দাম প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বন্যায় সিলেটে শুকনো খাবারের সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর নজরেও আনেন সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
মেয়র বলেন, ‘সামর্থ্য থাকলেও আমরা সিলেটে শুকনো খাবার পাচ্ছি না। শ্রীমঙ্গল থেকে খাবার আনার চেষ্টা করছি, তাও খুবই অল্প পরিমাণে। ঢাকা থেকে যদি খাবার না যায়, তবে এখানে শিশুখাদ্যের অভাব দেখা দেবে।’
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চিড়া, মুড়ি, গুড়ের একটি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে সিলেটের বাইরে থেকে পচুর পরিমাণে এসব পণ্য আসছে। ফলে সংকট কেটে যাবে। এই সুযোগে কেউ বেশি দামে পণ্য বিক্রি করলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
সারাদেশে বন্যায় ৩৬ জনের মৃত্যু
সারাদেশে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি পানিতে ডুবে এবং ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অনেকেই।
মঙ্গলবার (২১ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো বন্যা বিষয়ক এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ১৭ মে থেকে ২১ জুন পর্যন্ত বন্যায় রংপুর বিভাগে তিনজন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৫ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৮ জনসহ মোট ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বজ্রপাতে ১২ জন, সাপের কামড়ে একজন, বন্যার পানিতে ডুবে ১৭ জন এবং অন্যান্য কারণে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলাভিত্তিক মারা যাওয়া তালিকার শীর্ষে রয়েছে সিলেট। ১৭ মে থেকে ২১ জুনের মধ্যে সিলেট জেলায় ১০ জন, সুনামগঞ্জে পাঁচজন, ময়মনসিংহে পাঁচজন, নেত্রকোণায় চারজন, জামালপুরে তিনজন, শেরপুরে তিনজন, মৌলভীবাজারে তিনজন, কুড়িগ্রামে দুইজন এবং লালমনিরহাটে একজন মারা গেছেন।








