মৌলভীবাজার থেকে ফিরে: এখনও আছে পড়ার টেবিল, স্কুলের ক্লাসরুমে এখনও শোভা পায় তার হাতে আঁকা ছবি, সহপাঠীরা ফাঁকা রেখে দেয় বসার জায়গা- কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো সে আর নেই। ফিরবেও না কখনও, কোনো দিন। মৌলভীবাজারের লালারচক সীমান্তে গুলি করে জুড়ীর নিরোদ বিহারী উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী স্বর্ণা দাসের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ।
স্বর্ণার স্কুলের সহপাঠী থেকে শুরু করে কেউই এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, সে নেই। তাদের মনে হয়, এই তো কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসবে দূরন্ত মেধাবী স্বর্ণা। এসে হয়তোবা বলবে, কীরে কেমন আছিস তোরা? তবে স্বর্ণা আর ফিরবে না, সেই বাস্তবতা মনে পড়লেই কাঁদে সহপাঠীরা।
জুড়ীর প্রত্যন্ত এলাকায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, একই অবস্থা স্বর্ণার মা-বাবারও। মেয়ের স্মৃতি নিয়ে তেমন কিছুই বলতে পারলেন না তারা। তবে চোখের জল আর হৃদয়ের হাহাকার জানান দেয় বুকের ধন হারিয়েছেন তারা। স্বর্ণা যখন নিহত হয়, তখন সাথে ছিল মা। তিনি জানান, ‘গুলি খেয়ে মা বলে চিৎকার দিয়েছিল, আর কিছুই বলতে পারেনি স্বর্ণা।’ এরপর থেকেই আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেননি মা।
নিরোদ বিহারী স্কুলের শিক্ষকরাও জানালেন প্রিয় শিক্ষার্থীর কথা। তারাও হতবাক এমন ঘটনায়। বললেন, স্বর্ণা খুব মেধাবী ছিল। পড়াশোনা ও খেলাধূলায় সে ছিল খুবই মনযোগী ও পারদর্শী। সেই শিক্ষার্থীর এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছেন তারা।
‘স্বর্ণা খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। সে পড়াশোনা ও খেলাধুলায় মনযোগী এবং পারদর্শী ছিল। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বিভিন্ন বই নিয়ে পড়ত। আমাদের এমন মেধাবী শিক্ষার্থী এভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো, আমরা তা ভাবতেই পারছি না। আমরা আমাদের প্রিয় শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই’, এমন দাবি স্বর্ণার শ্রেণি শিক্ষকদের।
সীমান্তে যেন আর কোন গুলি না হয়, এমন আর্তি স্বর্ণার ভাই পিন্টু দাসের। তার ভাষায়, সীমান্তে গুলি কোন সমাধান নয়। কেউ যদি অন্যায় করে থাকে, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে। আইনের আওতায় তার বিচার হতে পারে। গুলি করা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
স্বর্ণা দাস খুন হওয়ার পর থেকেই পরিবারের পাশে ছিল বিজিবি। এরই ধারাবাহিকতায় পহেলা বৈশাখে পরিবারটিকে স্বাবলম্বী করার অংশ হিসেবে উন্নত জাতের একটি গাভী উপহার দিয়েছে বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়ন (৫২ বিজিবি)।

এর পাশাপাশি সাংবাদিক সংগঠন ইয়ুথ জার্নালিস্ট কমিউনিটি স্বর্ণার পরিবারকে বৈশাখী উপহার হিসেবে নগদ অর্থ সহায়তা দিয়েছে।
সীমান্তে যেন আর একটি প্রাণও না ঝরে সেই ব্যবস্থা নেওয়ার আর্তি উঠে এসেছে সবার কথায়। স্বর্ণা দাস হত্যাকাণ্ডের বিচার হলে সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় আসবে বলেও মনে করেন তারা। এক্ষেত্রে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার বদলে মানবিক হতে হবে। তাহলেই সীমান্তে আর ঝরবে না কোন প্রাণ। অকালে হারিয়ে যাবে না স্বর্ণা দাসের মতো সম্ভাবনাময় কোন ফুল।
উল্লেখ্য, গত ১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লালারচক সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র গুলিতে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণা দাস নিহত হয়।








