পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ছোট ও দ্রুতগতির নৌকার বহর আবারও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই কৌশলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন ইরানের নৌবাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ধ্বংস করেছে এবং বর্তমানে তা ছোট ছোট মেশিনগান সজ্জিত নৌকায় সীমাবদ্ধ। এসব নৌকা কম শক্তিশালী হলেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত কার্যকর।
এই ছোট নৌকার বহরকে অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মশা নৌবহর হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, এই নৌবহর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে বিশ্ব বাণিজ্যে চাপ তৈরি করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে প্রভাব ফেলা এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ কমাতে বাধ্য করা।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ১৯৮০-এর দশকে এই ধরনের দ্রুতগতির ছোট নৌকার কৌশল গড়ে ওঠে। তখন পারস্য উপসাগরে ট্যাংকার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তেল পরিবহন নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত হয় এবং ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনী বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। এরপর ইরান প্রতিপক্ষের বড় নৌবাহিনীর মোকাবিলায় ছোট, দ্রুত আক্রমণ সক্ষম নৌকার কৌশল গ্রহণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ গোলকার জানান, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এই কৌশল ব্যবহার করে সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে হয়রানি ও চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। এই কৌশলে বাণিজ্যিক জাহাজের কাছাকাছি গুলি চালানো, সমুদ্রে মাইন স্থাপন এবং একাধিক দিক থেকে দ্রুত নৌকার আক্রমণ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অনেক নৌকা রকেট বা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রেও সজ্জিত। কিছু নৌকা মাছ ধরার বা বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত নৌকা থেকে রূপান্তর করা হয়েছে। হাডসন ইনস্টিটিউটের গবেষক কান কাসাপোগলু বলেন, এসব নৌকা সস্তা এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য হওয়ায় ইরান তুলনামূলক কম ব্যয়ে প্রতিপক্ষের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরাসরি বড় জাহাজ ধ্বংস না করেও ঝুঁকির ধারণা তৈরি করলে বীমা খরচ বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করা জাহাজের সংখ্যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করছে, যা আগের স্বাভাবিক সংখ্যার মাত্র একটি ছোট অংশ।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোট জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমে যাওয়ায় দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ঝুঁকির মুখে পড়েছে।







