দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। ই-কমার্স, অনলাইন ব্যাংকিং, সরকারি ডিজিটাল সেবা, এবং মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রসার এ প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। তবে এই ব্যাপক ডিজিটাল কার্যক্রমের সাথে সাইবার হুমকির ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে।
বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিবেদনগুলো বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যেই সাইবার অপরাধের ক্ষতি বিশ্বব্যাপী বছরে ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ছাড়াবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, সীমিত অবকাঠামো এবং সাইবার সচেতনতার ঘাটতির কারণে আরও বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন।
এ অবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মেশিন লার্নিং (এমএল) সাইবার নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করার কার্যকর অস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রচলিত নিয়মভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার তুলনায় এআই বিশাল পরিমাণ নেটওয়ার্ক ট্রাফিক বিশ্লেষণ করতে পারে, অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করতে পারে, এবং রিয়েল-টাইমে হুমকি সনাক্ত করতে সক্ষম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এমএল অ্যালগরিদম স্বাভাবিক ব্যবহারকারী আচরণ এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ যেমন অননুমোদিত লগইন চেষ্টা, ফিশিং প্রচেষ্টা, বা ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে পড়া এর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করতে পারে।
এআই ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কর্মপ্রবাহ: নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ, অস্বাভাবিকতা সনাক্তকরণ, স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই সাইবার ঘটনা শনাক্তকরণে সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এআই-চালিত প্রতারণা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করতে পারে, যা ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়কে সুরক্ষা দেয়। নাগরিক তথ্য ব্যবস্থাপনা করা সরকারি প্ল্যাটফর্মগুলো এআই-ভিত্তিক অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ডেটা চুরি প্রতিরোধ করতে পারে এবং ডেটা প্রাইভেসির বিধান মেনে চলতে সহায়তা পায়।
তবে সাইবার নিরাপত্তায় এআই গ্রহণ করাও কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। মানসম্মত ডেটা ছাড়া কার্যকর এমএল মডেল তৈরি করা যায় না, এবং দক্ষ এআই পেশাদারের ঘাটতি এখনও বড় বাধা। অন্যদিকে, যেমন এআই নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করছে, তেমনি সাইবার অপরাধীরাও এআই ব্যবহার করে আরও জটিল আক্রমণ যেমন, ডিপফেক ফিশিং ইমেইল বা এআই-চালিত ম্যালওয়্যার তৈরি করছে। ফলে সাইবার স্পেসে এক ধরনের প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতেই থাকে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে সাইবার নিরাপত্তা ও এআই গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলো এআই-ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষায়িত প্রোগ্রাম চালু করতে পারে।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এআই-চালিত নিরাপত্তা সমাধান গ্রহণের পাশাপাশি আইটি টিমকে নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নে উৎসাহিত করা উচিত। এ ছাড়া, জাতীয় পর্যায়ে এআই ব্যবহার, নৈতিক এআই, এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি নিয়ে নীতি প্রণয়ন দেশের সাইবার স্থিতিশীলতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, এআই এবং এমএল কোনো ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়; আধুনিক সাইবার হুমকি মোকাবিলায় এগুলো এখন অপরিহার্য। বাংলাদেশের জন্য প্রযুক্তি গ্রহণ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, এবং সঠিক নীতিমালা এই তিনের সমন্বিত উদ্যোগ এআই-কে ডিজিটাল অবকাঠামোর এক কার্যকর নিরাপত্তা বর্মে রূপান্তর করতে পারে। দেশ যখন দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে, তখন সাইবার নিরাপত্তায় এআই এর কার্যকর ব্যবহার নির্ধারণ করবে কেবল সেবার নিরাপত্তাই নয়, বরং নাগরিকদের ডিজিটাল সেবার প্রতি আস্থা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








