বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ইলন মাস্ক। শেয়ার বাজারের ইতিহাসে স্পেসএক্স-এর সবচেয়ে বড় অভিষেকের ফলে তার সম্পদ এখন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
শনিবার (১৩ জুন) সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ব্লুমবার্গের তালিকা অনুযায়ী, টেসলা ও স্পেসএক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা মাস্ক বিশ্বের শীর্ষ ধনী হিসেবে নিজের অবস্থান আরও মজবুত করেছেন। বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলার।
রকেট তৈরি, টেলিযোগাযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ করা স্পেসএক্স কোম্পানিটি ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য নিয়ে নাসডাক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে। কোম্পানিটি শুরুতে প্রতিটি শেয়ারের দাম ১৩৫ ডলার প্রস্তাব করলেও লেনদেন শুরু হয় ১৫০ ডলারে।
মহাকাশ গবেষণা ও মাস্কের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহের কারণে এক পর্যায়ে শেয়ারের দাম ১৭৬ দশমিক ৫০ ডলারে উঠে যায়। তবে দিনশেষে প্রতিটি শেয়ার ১৬১ ডলারে বিক্রি হয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) উন্মুক্ত বাজারে আসার আগেই বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছিল স্পেসএক্স। এই কোম্পানিতে মাস্কের ৪২ শতাংশ মালিকানা রয়েছে, যা তাকে প্রতিষ্ঠানের সব বিষয়ে একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। তিনি চাইলে বিনিয়োগের এই অর্থ নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো খাতে ব্যয় করতে পারবেন।
ব্লুমবার্গের হিসাব অনুযায়ী, লেনদেন শেষে স্পেসএক্স-এ মাস্কের শেয়ারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৬৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া তার হাতে আরও ৫৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের স্পেসএক্স অপশন রয়েছে। পাশাপাশি টেসলা কোম্পানিতে তার ১৬৮ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার এবং ১১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের অপশন রয়েছে। সব মিলিয়ে ইলন মাস্ক এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন।
সম্পদ বৃদ্ধিতে নতুন বিতর্ক
ইলন মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পরপরই বৈশ্বিক সম্পদ বৈষম্য নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ এখন প্রায় পোল্যান্ড বা সুইজারল্যান্ডের পুরো অর্থনীতির আকারের সমান।
এত বিপুল সম্পদ মাস্ককে আগেই বিশ্ব রাজনীতির এক প্রভাবশালী, তবে একই সঙ্গে বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সমালোচনা করার পর তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের র্নির্বাচনী প্রচারে শত শত মিলিয়ন ডলার অনুদান দেন। গত বছর কয়েক মাস তিনি ‘ডিপার্টমেন্ট ফর গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (ডিওজিই)-এর নেতৃত্বও দেন।
সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাস্কের তত্ত্বাবধানে বন্ধ করে দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রম।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ ধরনের ব্যয়সংকোচনের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।
মাস্ক যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে অভিবাসন এবং জাতিগত বিভাজনসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি প্রায়ই বিতর্কিত মন্তব্য করে থাকেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সঙ্গেও তার একাধিকবার প্রকাশ্য বিরোধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ শিক্ষার্থী হেনরি নোভাক হত্যাকাণ্ড নিয়েও দুজনের মতবিরোধ দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও এলিজাবেথ ওয়ারেনসহ অনেক রাজনীতিক মাস্কের ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার ঘটনাকে সমালোচনা করেছেন। ওয়ারেন এটিকে ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করে ধনীদের ওপর সম্পদ কর আরোপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
তবে মাস্কের এই বিপুল সম্পদের বেশিরভাগই কাগুজে সম্পদ। কারণ তার সম্পদের প্রায় পুরোটা টেসলা ও স্পেসএক্সের শেয়ারের মূল্যনির্ভর। অন্তত এক বছর পর্যন্ত তিনি স্পেসএক্সের কোনো শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না।
স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক ৪ হাজার ৪০০-এর বেশি কর্মীকেও কোটিপতি বানিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা বেতনের অংশ হিসেবে কোম্পানির শেয়ার পেয়েছিলেন।
তবে স্পেসএক্সের বিপুল মূল্যায়নের বড় অংশই ভবিষ্যৎ আয় ও সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, (এখন পর্যন্ত) প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাফল্যের ওপর নয়।
বর্তমানে কোম্পানিটি লাভজনক নয়। অর্থাৎ পরিচালন কার্যক্রম থেকে যত আয় করছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে।
আর্থিক নথি অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে ২০২৫ সাল ও ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত স্পেসএক্স ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি লোকসান করেছে।
স্পেসএক্স: রকেট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
স্পেসএক্সের মূল ব্যবসা হলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশযুক্ত রকেট তৈরি ও উৎক্ষেপণ। কোম্পানিটি স্টারলিংক ইন্টারনেট স্যাটেলাইটও তৈরি ও উৎক্ষেপণ করে। আর চলতি বছরে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান এক্সএআই অধিগ্রহণের মাধ্যমে স্পেসএক্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতেও প্রবেশ করেছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ রকেট প্রযুক্তি, স্টারলিংক সেবার জন্য নতুন স্যাটেলাইট এবং এআই খাতে বিনিয়োগে ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে কক্ষপথে ডেটা সেন্টার নির্মাণের মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও রয়েছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য প্রকাশিত নথি অনুযায়ী স্পেসএক্সের ঘোষিত লক্ষ্য, ‘মানবজীবনকে বহু গ্রহে বিস্তৃত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি গড়ে তোলা, মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ বোঝা এবং চেতনার আলোকে নক্ষত্র পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া।’
কোম্পানিটি আরও জানিয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও সাফল্যের বড় অংশ নির্ভর করছে তথাকথিত ‘চন্দ্র অর্থনীতি’ গড়ে তোলার ওপর।
এই ধারণার অর্থ হলো চাঁদ ও মঙ্গলে নিয়মিতভাবে মানুষ এবং মালামাল পরিবহন করা। এমন কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলতে পারলেই সেখানে একটি প্রকৃত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। তবে এমন পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না, সে বিষয়ে স্পেসএক্স নিজেই নিশ্চিত নয়।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, ‘আমাদের অনেক উদ্যোগে জটিল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ, পরীক্ষিত নয় এমন প্রযুক্তি কিংবা এখনও অস্তিত্বহীন প্রযুক্তি জড়িত। ফলে এসব উদ্যোগ বাণিজ্যিকভাবে সফল নাও হতে পারে।’
এই অনিশ্চয়তা অবশ্য শুক্রবার বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে কোনো প্রভাব ফেলতে দেখা যায়নি।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, শেয়ারের দাম বৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে ইলন মাস্কের ভবিষ্যৎ-দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বিনিয়োগকারীদের বিপুল আগ্রহ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মহাকাশকেন্দ্রিক স্বপ্ন নিয়ে তিনি বহুদিন ধরেই নক্ষত্রের দিকে হাত বাড়িয়ে আছেন। মনে হচ্ছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে তার এই উচ্ছ্বাসে অনেক বিনিয়োগকারীও শামিল হয়েছেন।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুক্রবারের শেয়ারদর বৃদ্ধি ‘মৌলিক আর্থিক ভিত্তির চেয়ে বেশি হারে প্রত্যাশা ও বাজারে শেয়ারের সীমিত সরবরাহের কারণে হয়েছে।’

